নেপালের ত্রিশূলী নদীর পাড়ে আকস্মিক বন্যায় এক বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্য নিখোঁজ হয়েছেন। পর্যটক মুনতাসির তার স্ত্রী তাহমিনা ও দুই সন্তান নাওয়াফ এবং ইরাকে নিয়ে আট দিনের ছুটিতে নেপালে গিয়েছিলেন। বন্যার তিন দিন পরও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। মুনতাসির এখন পাহাড়ি এলাকার একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে নিখোঁজদের নাম লেখা হচ্ছে ব্ল্যাকবোর্ডে।
ঘটনার দিন সকালে হোটেল থেকে বের হয়ে পরিবারটি নদীর ঝুলন্ত সেতুর দিকে যাচ্ছিল। মুনতাসির পাওয়ার ব্যাংক আনতে হোটেলে ফিরেছিলেন। তখন স্ত্রী ফোন করে সানগ্লাস আনার কথা বলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাহাড় থেকে ধূসর কালো পানির বিশাল দেয়াল নেমে আসে। সেতুটি ভেঙে পড়ে, সাথে সাথেই মানুষ ও পতাকা ভেসে যায়। মুনতাসির ছুটতে গিয়ে পাথরের ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে যান। স্রোত তাকে হোটেলের দ্বিতীয় তলার গ্রিলে আছড়ে ফেলে।
পরদিন উদ্ধারকারীদের সঙ্গে নিচে নেমে মুনতাসির একটি লাল জুতা পান। জুতাটি ছোট, ডান পায়ের, কাদায় অর্ধেক ডোবা। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন সেটি মেয়ে ইরার। কিন্তু পরে এক স্থানীয় নারী এসে জানান, সেটি তার নিখোঁজ মেয়েরও হতে পারে। মেয়ের নাম পেমা। জুতার ভেতরে নাম লেখা না থাকায় দুজনই নিজেদের মেয়ের জুতা হিসেবে দাবি করতে পারেননি। শেষে তারা জুতাটি নিখোঁজ জিনিসের টেবিলে রেখে দেন।
শুক্রবার এক রাখালের খবরে জানা যায়, পুরোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে বন্যার দিন কয়েকজনকে পালাতে দেখা গেছে। সুড়ঙ্গের মুখ ধসে বন্ধ, তবে রাতে ভেতর থেকে শব্দ শোনা গেছে। উদ্ধারকারী দলসহ মুনতাসির সেখানে পৌঁছে একটি পানির বোতল পান, যাতে কালো মার্কার দিয়ে ‘N.R.’ লেখা। মুনতাসির দাবি করেন, এটা তার ছেলে নাওয়াফের হাতের লেখা। এরপর তারা পাথর সরানোর চেষ্টা শুরু করেন।
সুড়ঙ্গের মুখ প্রায় খুলে এলে ভেতর থেকে একটি শিশুর কণ্ঠ শোনা যায়—‘বাবা’। তারপর একটি ক্ষীণ আলো দেখা যায়, যা ডানে-বাঁয়ে নড়ছে। মুনতাসির চিৎকার করে স্ত্রীর নাম ডাকেন। ভেতর থেকে একসঙ্গে কয়েকটি কণ্ঠ সাড়া দেয়। কিন্তু ঠিক তখনই পাহাড় থেকে দ্বিতীয় ঢল নেমে আসে। উদ্ধারকর্মীরা মুনতাসিরকে টানতে থাকেন। সে এক হাতে পাথর আঁকড়ে ধরে, অন্য হাত অন্ধকারের দিকে বাড়ায়। ভেতর থেকে একটি ছোট হাতও এগিয়ে আসে। কিন্তু পানি ও পাথরের গর্জনে সব হারিয়ে যায়। শেষে মুনতাসির স্পষ্ট শোনেন, কেউ তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকছে—ইরা বা পৃথিবীর সব হারানো শিশু।
বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা মুনতাসিরের সঙ্গে কথা বলেছেন। ঢাকায় তার পরিবার খবর পেয়ে শোকস্তব্ধ। মুনতাসির এখনো আশা ছাড়েননি। তিনি বলেছেন, ‘ওরা একসঙ্গে আছে’—এ কথা তিনি প্রার্থনা হিসেবে উচ্চারণ করেছেন।



