দেশের আমদানি কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন এনেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সোমবার (২৪ আগস্ট) 'আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯' জারি করা হয়েছে, যা ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। নতুন এই নীতিতে রপ্তানিকারকের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা ছাড়াই যেকোনো পরিমাণ পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে এমন ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের বার্ষিক মূল্যসীমা প্রযোজ্য ছিল।

নতুন নীতিতে পণ্যের উৎস দেশ সম্পর্কে তথ্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে পণ্যের উৎসে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা গ্রহণ সহজতর হবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে 'ফ্রি অব কস্ট' (এফওসি) ভিত্তিতে পণ্য আনার সুবিধাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

নতুন নীতির কিছু দিক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি এফওসির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্তকে একই রকম করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এফওসিতে পণ্য আমদানি করলে নিরাপদে রপ্তানি সম্ভব এবং রপ্তানি আদেশ বাতিলের ঝুঁকিও থাকে না। তবে পোশাক খাতের মতো নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমদানি করে রপ্তানির সুযোগ দেওয়ায় তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।

মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ), সমন্বিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি (সিইপিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) মতো আন্তর্জাতিক চুক্তির সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও নতুন নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। আমদানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পণ্য যাচাই, নথিপত্র ও সনদ প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা হয়েছে। পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার অসামঞ্জস্যজনিত জটিলতা কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিতে মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বেড়ে ৩৭৫ সিসি হয়েছে, যা আগে সর্বোচ্চ ১৬৫ সিসি ছিল। এছাড়া মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো 'প্রবাসী বাংলাদেশি'র সংজ্ঞা যুক্ত করে তাদের মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যবসা সহজ করতে এই আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে শুল্ক সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এফওসি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজনে বিভিন্ন ধারা সংশোধন করা যাবে।

নতুন আমদানি নীতিতে মোট ২৮ শ্রেণির পণ্য আমদানিনিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চিংড়ি, জীবিত শূকর, পপি সিড, ঘাস, ভাং, ঘন চিনি, কৃত্রিম সরিষার তেল, ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, নিম্নমানের বা পুরোনো পণ্য, রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট, শিল্প স্লাজ, বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদি। স্টকহোম কনভেনশনের আওতাধীন বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক, ৭৫ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বের হর্ন, পলি প্রোপিলিন ও পলিথিন ব্যাগ, দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের থ্রি-হুইলারও নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে। ভুল মানচিত্র, অশ্লীল সাহিত্য ও হরর কমিকসও আমদানি করা যাবে না।

শর্ত সাপেক্ষে আমদানি করা যাবে এমন নিয়ন্ত্রিত পণ্যের তালিকায় রয়েছে ফার্নেস অয়েল, নির্দিষ্ট মাপের কারেন্ট জাল, পাঁচ বছরের পুরোনো গাড়ি ও তিন বছরের বেশি পুরোনো ১৬৫ সিসির ঊর্ধ্বের মোটরসাইকেল। উপমহাদেশীয় ভাষার চলচ্চিত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও যৌথ প্রযোজনার সিনেমা এবং রপ্তানির বিপরীতে সমসংখ্যক চলচ্চিত্র আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। খেলনা আমদানিতে বয়স উল্লেখ ও প্লাস্টিকের খেলনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়—এমন সনদের প্রয়োজন হবে। স্ক্র্যাপ ভেসেল আমদানিতে জাহাজে বিপজ্জনক বর্জ্য নেই মর্মে প্রত্য�়নপত্র দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যুদ্ধজাহাজ আমদানি কেবল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং তরবারি-বে�়নেট আমদানি ব্যবহারকারী সংস্থার ছাড়পত্রে সম্ভব হবে।