বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি গুলশানে জেট্রোর কার্যালয়ে কথা বলেছেন সংস্থাটির নতুন কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ কাজুইকি কাতাওকা। ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব নেওয়া এই কর্মকর্তা জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন অব ঢাকার মহাসচিব এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) যুগ্ম মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে কাতাওকা বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন দেশের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা। তবে রাজনৈতিক পরিবেশের উন্নতি ঘটেছে, যা জাপানি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর বেশ কয়েকটি জাপানি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে এসেছেন এবং নতুন বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রধান প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে তিনি তিনটি বিষয় তুলে ধরেন — শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতা, মূলধন ও মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাঠিন্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সুরক্ষার অভাব। তার মতে, দুর্নীতি এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা দূর করা কঠিন। শুল্কায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু অনেক কোম্পানি আন্ডার-ইনভয়েসিং করায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে বৈধ ব্যবসায়ীদের প্রকৃত চেয়ে বেশি শুল্ক দিতে হয়।

মুনাফা repatriation প্রক্রিয়াও অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বলে মন্তব্য করেন তিনি। টাকা পাঠাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য বিডা, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকে বারবার যেতে হয়। অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষায় সরকারের আগ্রহ কম বলে মন্তব্য করে তিনি উল্লেখ করেন, নকল পণ্যের কারণে সিটিজেন ক্যালকুলেটর ও ওমরনের মতো ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

শ্রম খরচ কম হলেও সামগ্রিক ব্যয় যে কম নয়, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন জেট্রো প্রতিনিধি। তার ভাষ্যে, পরিষেবা মূল্য, জমি অধিগ্রহণ খরচ এবং সরকারি প্রক্রিয়ার বিলম্বের কারণে মোট খরচ অনেক ক্ষেত্রে মিয়ানমার বা শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি। এ অবস্থায় ব্যবসার পরিবেশ আকর্ষণীয় করতে শুধু শ্রমখাতে নয়, বরং মোট খরচের দিকে নজর দিয়ে অহেতুক ব্যয় হ্রাস করার পরামর্শ দেন তিনি।

সরকারের সংস্থা একীভূতকরণ উদ্যোগ সম্পর্কে কাতাওকা জানান, এটি মূলত তাদেরই প্রস্তাব ছিল। বিডা, বেজা ও পিপিপি কার্যালয় একীভূত করা হচ্ছে — এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের, বিশেষত মধ্য ও নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইতিবাচক মনোভাব ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। অহেতুক হয়রানি বন্ধ না হলে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি। সাম্প্রতিক প্রবণতা লক্ষ করে তিনি জানান, আগে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করত, কিন্তু এখন অনেক কোম্পানি অভ্যন্তরীণ বাজারকে লক্ষ্য করে বিনিয়োগ করছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিত্যব্যবহার্য পণ্য (এফএমসিজি) খাত এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সম্প্রতি মিতসুই কোম্পানি এসিআই লজিস্টিকসে (স্বপ্ন) এবং মিতসুবিশি করপোরেশন র্যাংগস গ্রুপে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এই প্রবণতারই প্রতিফলন।

জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখনো অনেক জমি খালি পড়ে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এটি একমাত্র অঞ্চল যা জাতীয় মানদণ্ড পূরণ করে। সিঙ্গারসহ কয়েকটি কোম্পানি সেখানে উৎপাদন শুরু করলেও মোট কার্যক্রম এখনো ১০টির কম। কিছু কোম্পানি জমি নিয়েও কাজ শুরু করেনি এবং পর্যবেক্ষণ করছে। এর পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট দায়ী। তবে নতুন সরকার গঠনের পর অনেক জাপানি কোম্পানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।

আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে কাতাওকা বলেন, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করতে পারলে বাংলাদেশ জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি উৎপাদন হাব হয়ে উঠতে পারে। সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা বিদ্যমান।

আগামী ৫-১০ বছরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বহুমুখী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। শুধু টেক্সটাইল নয়, ইস্পাত আমদানি, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে। ইপিএ চুক্তির আওতায় শুল্ক হার কমার ফলে ইস্পাত আমদানি আরও বৃদ্ধি পাবে। দেশে ধনী পরিবারের সংখ্যা বাড়ায় জাপানি উচ্চমানের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টির সম্ভাবনাও দেখছেন তিনি।