শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা সদরের মাছবাজার গলির ভেতরে অবস্থিত একটি ছোট হোটেল, যা দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম না থাকলেও স্থানীয়দের কাছে এটি 'সালাম হোটেল' নামেই পরিচিত। ব্রিটিশ আমলের ১৯২০ সালের দিকে সুরত আলী খান এই খাবারের ব্যবসার সূচনা করেছিলেন। পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর তীরে অবস্থানের কারণে নদী মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকায় প্রথমে কীর্তিনাশা নদীর ঘাটে, পরে বাজারের ভেতরে এবং উপজেলা পরিষদের সামনে এই হোটেলটি পরিচালিত হয়। বর্তমানে এটি মাছবাজার গলিতে অবস্থিত।

হোটেলটির বর্তমান পরিচালক ৮৪ বছর বয়সী আব্দুস সালাম খান। ১৯৬৯ সালে তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯০ সালে বাবার মৃত্যুর পর হোটেলটি বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনেন। প্রায় ৫৭ বছর ধরে তিনি এটি সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করছেন। প্রতিদিন দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এখানে খাবার পরিবেশন করা হয়, তবে সরকারি ছুটির দিনে হোটেলটি বন্ধ থাকে।

এই হোটেলের প্রধান আকর্ষণ হলো পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর টাটকা মাছ। মেন্যুতে রয়েছে ইলিশ, পাঙাশ, আইড়, বোয়াল ও চিংড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট মাছ। এছাড়াও দেশি মুরগি ও খাসির মাংস পাওয়া যায়। মানের ব্যাপারে আপসহীন এই হোটেলের বিশেষ নিয়ম হলো—বাজারে টাটকা নদীর মাছ না পাওয়া গেলে সেদিন হোটেলটি বন্ধ রাখা হয়। বর্তমানে এক টুকরা ইলিশের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পাঙাশ, আইড় ও বোয়ালের দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং ছোট মাছের এক প্লেটের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। খাসি ও মুরগির মাংসের পিস বিক্রি হয় ২০০ টাকায়।

রান্নার দায়িত্বে গত ৪২ বছর ধরে নিয়োজিত হাসিনা বেগম। কিশোরী বয়সে মসলা বাটার কাজ দিয়ে শুরু করলেও এখন তিনিই এই হোটেলের প্রধান বাবুর্চি। কাঠের চুলায় রান্না করা এই খাবারের বিশেষত্ব হলো প্রতিদিন বাজার থেকে তাজা উপকরণ সংগ্রহ করা এবং বাসি কোনো উপাদান ব্যবহার না করা। গ্রাহকদের মতে, এখানকার রান্নার স্বাদ ঠিক বাড়ির মতো, যার ফলে দাম কিছুটা বেশি হলেও মানুষ এখানে আসতে পছন্দ করেন।

মালিক আব্দুস সালাম খানের মতে, মানুষের ভালোবাসাই এই দীর্ঘ পথচলার মূল শক্তি। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন গ্রাহক এখানে খাবার খান এবং দৈনিক প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বিক্রি হয়। সাতজন কর্মী নিয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো তার স্বকীয়তা বজায় রেখেছে।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ূম খান জানান, এই হোটেলটি তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য সুনাম অর্জন করেছে। উপজেলা প্রশাসন পদ্মা নদীর তীরে মাছকেন্দ্রিক পর্যটন চালু করার পরিকল্পনা করছে, যার সঙ্গে এই ধরনের প্রাচীন হোটেলগুলোকে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আধুনিকায়নের জন্য সহায়তা প্রয়োজন হলে প্রশাসন পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।