লিবিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর পূর্ণ হলো। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর এক নাটকীয় ও করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকের ৪২ বছরের দীর্ঘ রাজত্ব। এক সময় আরব ও আফ্রিকা বিশ্বে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত গাদ্দাফি শেষ জীবনে এক নর্দমার পাইপে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হন, যেখান থেকে তাঁকে টেনে বের করে হত্যা করা হয়।
১৯৪২ সালে লিবিয়ার সিরতে অঞ্চলের একটি সাধারণ বেদুইন পরিবারে গাদ্দাফির জন্ম। ইতালীয় উপনিবেশিক শাসনকালে বড় হওয়া এই তরুণ রাজনৈতিকভাবে আরব জাতীয়তাবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। বিশেষ করে মিশরের নেতা জামাল আবদেল নাসেরের দর্শন তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৭ বছর বয়সে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজতন্ত্র উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেন তিনি। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি লিবিয়া থেকে মার্কিন ও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে দেন এবং তেলের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেন, যা তাঁকে আরব বিশ্বের কাছে এক সাহসী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
গাদ্দাফির শাসনকাল ছিল বৈচিত্র্যময় ও রহস্যময়। তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন 'দ্য গ্রিন বুক' বা 'সবুজ বই' প্রকাশ করেন, যেখানে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে আরব জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি নীতির সমন্বয়ে এক নতুন ব্যবস্থার কথা বলা হয়। তাঁর শাসনে লিবিয়া তেলসমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয় এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, যার ফলে বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে লিবিয়া হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় কর্মস্থল। তবে এই স্থিতিশীলতার আড়ালে ছিল কঠোর দমন-পীড়ন। রাজনৈতিক বিরোধীদের নিপিড়ন এবং শত শত নারীর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অদ্ভুত; বিদেশ সফরে তিনি হোটেলের বদলে তাঁবুতে থাকা পছন্দ করতেন এবং তাঁর দেহরক্ষী হিসেবে নিযুক্ত থাকত সশস্ত্র নারীদের দল, যাদের 'অ্যামাজোনিয়ান গার্ড' বলা হতো।
পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে গাদ্দাফির সম্পর্ক ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁকে 'মধ্যপ্রাচ্যের পাগলা কুকুর' বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৮০-র দশকে তেল নিষেধাজ্ঞা এবং বিমান হামলা সংক্রান্ত অভিযোগের কারণে লিবিয়া আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে। তবে ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণার পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্বাভাবিক হয়।
২০১০ সালে শুরু হওয়া 'আরব বসন্ত' গাদ্দাফির পতনের পথ প্রশস্ত করে। বেনগাজিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে তিনি কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিলেও তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ন্যাটোর সামরিক সহায়তায় বিদ্রোহী বাহিনী বা ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) ত্রিপোলি দখল করে নেয়। অবশেষে সিরতে শহরে ন্যাটোর বিমান হামলায় তাঁর গাড়িবহর ধ্বংস হলে তিনি একটি নর্দমার পাইপে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তাঁকে টেনে বের করে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এনটিসি দাবি করেছিল গোলাগুলির সময় তিনি মারা যান, তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদন্তে জানা যায়, বন্দী অবস্থায় তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।
গাদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়াতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আশা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান লিবিয়া দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শাসনকেন্দ্রে বিভক্ত হয়ে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, মাত্র ৩২ শতাংশ লিবিয়ান মনে করেন যে বিপ্লবের পর দেশ আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, গাদ্দাফির শাসনামলের তুলনায় বর্তমান লিবিয়া অনেক বেশি অস্থিতিশীল ও বিভক্ত।




