উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান উপকূলের জলসীমায় সম্প্রতি একাধিক বিশাল ও বিলাসবহুল নৌযানের আনাগোনা শনাক্ত করা হয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে, জুলাই মাস থেকে চলতি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানে বিশেষ কিছু প্রমোদতরির উপস্থিতি দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নৌযানটির দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার বা ২৬৩ ফুট, যার ডেকে রয়েছে ৫০ মিটারের একটি সুইমিং পুল এবং আকর্ষণীয় ওয়াটার স্লাইড। দীর্ঘদিন মেরামতের পর জুলাইয়ের শুরুতে নৌযানটি ওয়ানসানের কালমা উপদ্বীপের কাছে আনা হয়। মূলত কিম জং উন ও তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত বিনোদনের জন্যই এই নৌযান ও ওই এলাকার প্রাসাদে ব্যবহৃত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যানুযায়ী, উত্তর কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। দেশটির বাজেটের অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয় সামরিক সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা পারমাণবিক কর্মসূচিতে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন এবং বিপুল সংখ্যক নাগরিক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠোর, যেখানে অনেককে জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়। অথচ সাধারণ মানুষের এই অনাহারের বিপরীতে শাসকগোষ্ঠীর জীবনযাপন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ।

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা রি জং হো জানান, এই নৌযানগুলো শীতকালে জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে রাখা হয় এবং গ্রীষ্মের শুরুতে কিম পরিবারের অবকাশযাপনের জন্য ওয়ানসানের ভিলার কাছে নিয়ে আসা হয়। ওই এলাকায় মোট চারটি বড় নৌযান শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৫০, ৫৫, ৬০ এবং ৮০ মিটার। এই ধরনের প্রমোদতরির বাজারমূল্য কয়েক কোটি থেকে ১০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর আগে কিমের ২৯ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ছোট নৌযানের দাম প্রায় ৭০ লাখ ডলার ধরা হয়েছিল।

গোয়েন্দা সূত্র এবং জীবনীকারদের মতে, ওয়ানসান শহরের সঙ্গে কিম পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। কিম জং উন তাঁর শৈশবের অনেকটা সময় এখানেই কাটিয়েছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই অবকাশযাপনের কথা বলা হয় না এবং এসব সফরকে সরকারি কার্যক্রম হিসেবে প্রচার করা হয়, তবে দেশত্যাগী নাগরিকদের মতে এটি একটি খোলা রহস্য। ওয়ানসানে পর্যটকদের জন্য হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য সেগুলোর খরচ বহন করা অসম্ভব। যেখানে ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ৬৬৭ ডলার, সেখানে স্থানীয়দের জন্য চার রাতের একটি ভ্রমণ প্যাকেজের দাম প্রায় ১০০ ডলার, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে।

এছাড়া দেশটিতে সাধারণ নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতা অত্যন্ত সীমিত। শহর বা জেলার বাইরে যেতে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, কিম জং উন যখনই জনসমক্ষ থেকে দূরে থাকেন, তখনই এই বিলাসবহুল নৌযানগুলোর সক্রিয়তা বেড়ে যায়। সাবেক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান ২০১৩ সালে কিম জং উনের সঙ্গে ওয়ানসানে সময় কাটিয়েছিলেন এবং সেখানে ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযানে বিনোদনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রচারে কিম জং উনকে একজন আত্মত্যাগী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তব চিত্র বলছে সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের বিপরীতে তিনি এবং তাঁর পরিবার অতি-বিলাসবহুল জীবন অতিবাহিত করছেন।