বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনি এলাকার জেলে মিরাজ শেখকে গুমের অভিযোগে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক তাঁকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার জোর দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সোমবার সকাল ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি তোলা হয়। সংগঠনটি, আইনি সহায়তা সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং নিখোঁজের পরিবার যৌথভাবে এই আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন ৩০ বছর বয়সী মিরাজ। তিনি সুন্দরবনে মাছ ধরার কাজ করেন এবং পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেলও চালান। গত ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনার তদন্তে গত ২২ আগস্ট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এইচআরএসএসের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে তাঁরা মিরাজের পরিবার, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন। পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিখোঁজের পর ১০ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে মোংলা পন্টুন কোস্টগার্ডের এক সদস্যের সঙ্গে মিরাজের পরিবারের একাধিকবার কথোপকথন হয়। ওই সদস্য তখন স্বীকার করেন যে মিরাজ তাদের হেফাজতে রয়েছেন এবং আশ্বাস দেন যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২-৩ দিনের মধ্যে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে, নতুবা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। ১১ এপ্রিল সকালে মিরাজের স্ত্রী দিগরাজ কোস্টগার্ড বেজ ক্যাম্পে গেলে উকাসিং নামে এক সদস্য জানান, মিরাজকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হয়েছে এবং বিকেলে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু বিকেল ৪টায় ক্যাম্পে গেলে শাহীন নামে আরেক সদস্য আটকের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
এইচআরএসএস আরও জানায়, দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে, কোস্টগার্ড কার্যালয়ে বারবার গেছে এবং হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তবে কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। এছাড়া মিরাজের সন্ধানে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পরে মিরাজকে ফেরত দেওয়া এবং সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবিতে পরিবার ও গ্রামবাসীর ওপর লাঠিচার্জের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়ায়। এর জেরে মিরাজের মা, বোন ও স্ত্রীসহ ৪৪ জনের নামে মামলা হয়েছে, যেখানে অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি জোরালো দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে — হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মিরাজকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় আদালতে হাজির করা, আইন প্রতিপালনে ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, মিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনে আদালতে সোপর্দ করা, জড়িত কোস্টগার্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং গুম প্রতিরোধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা প্রদান করা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এইচআরএসএসের প্রধান উপদেষ্টা নূর খান লিটন বলেন, মিরাজ শেখের গুমের ঘটনায় মুখ খুলতে গ্রামবাসীকে নানা ভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। একজন সাক্ষী ভয়ে কথা বলতে চাননি, কোনো প্রশ্ন করার আগেই তিনি কিছু দেখেননি বলে জানান। অথচ ওই ব্যক্তি আগে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং তাঁর সাক্ষ্যের ভিডিও বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। গ্রামের মানুষকে মামলা দেওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় কিছু তথ্য অনুসন্ধান করা হয়েছে এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। পরে কোস্টগার্ডের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হবে।
ব্লাস্টের আইন শাখার পরিচালক আইনজীবী মো. বরকত আলী বলেন, রাষ্ট্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মিরাজ শেখকে সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফেরত দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হওয়া উচিত।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন জানান, ঘটনার পর তিনি পন্টুনে গিয়ে দেখেন দুইজন সাদাপোশাকধারী কোস্টগার্ড সদস্য মিরাজকে ধাক্কা দিয়ে একটি নৌকায় তুলছেন। কিছুক্ষণ পর মোংলার দিক থেকে একটি স্পিডবোট আসে, যাতে ৭-৮ জন ইউনিফর্ম পরা সদস্য ছিলেন এবং তাতে স্পষ্টভাবে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড লেখা ছিল। ঘটনার রাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. নাজমুলের মাধ্যমে কোস্টগার্ড স্টেশনের ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিরাজকে নেওয়া হয়েছে এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী মনিরুজ্জামান, হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম, মিরাজের মা তাসলিমা বেগম ও বোন লিজা ইসলাম।




