ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে অনুমোদিত শয্যার চার গুণ রোগীকে একই সঙ্গে সেবা দিতে হচ্ছে। ফলে শয্যার অভাবে অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের বারান্দা, করিডর এমনকি মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এক হাজার শয্যার এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন, যা সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

গত সোমবার নতুন আটতলা ভবনের লিফটের বাইরের অংশে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং হুড়োহুড়ির সময় কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনার পর থেকে হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে হাসপাতাল প্রশাসনের দাবি, সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেই তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বুধবার দুপুরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলার করিডরে দেখা যায়, প্লাস্টিকের মাদুর বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বেশ কয়েকজন রোগী। সেখানে নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রোগী ও স্বজনেরা অবস্থান করছিলেন। টাঙ্গাইলের মধুপুরের ভ্যানচালক আবুল হোসেন (৬৫) চার দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু তাঁর জন্য কোনো শয্যা মেলেনি। করিডরে একটি প্লাস্টিকের মাদুরেই তাঁর চিকিৎসা চলছে। তাঁর স্ত্রী সমলা আক্তার বলেন, কোথাও জায়গা নেই বললেই চলে, এই অবস্থায় স্বামীর চিকিৎসা চলছে কিন্তু সিট পাওয়ার কোনো উপায় নেই।

রোগীর চাপের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা গেছে ষষ্ঠ তলার শিশু ওয়ার্ডে। ৬০ শয্যার এই ওয়ার্ডে বুধবার দুপুরে ভর্তি ছিল ৩৫০ জন রোগী। ওয়ার্ডের বারান্দা, মেঝে ও লিফটের সামনের জায়গা রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে একেবারে ঠাসা। ত্রিশালের চকরামপুরের সেলিনা আক্তার তাঁর এক বছর বয়সী মেয়ে আফরাকে জ্বর ও ঠান্ডা-কাশি নিয়ে সকালে ভর্তি করান। মেঝেতে পাতা প্লাস্টিকের মাদুরে ঘুমিয়ে ছিল শিশুটি, আর পাশ দিয়ে কোনোমতে চলাচল করছিলেন অন্যরা। তিনি বলেন, পা ফেলারও জায়গা নেই, কিন্তু এখান থেকে আর কোথাও যাওয়ার উপায়ও নেই।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চাপ সবচেয়ে বেশি। পুরোনো ভবনের ১৭০ শয্যার এই বিভাগে বুধবার দুপুরে ভর্তি ছিলেন ৯৮৮ জন রোগী, অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যার প্রায় ছয় গুণ। সার্জারি বিভাগে ১৫০ শয্যার বিপরীতে রোগী ছিলেন ৪৮৭ জন। অন্যান্য বিভাগেও একই চিত্র। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা ছাড়াও টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও গাজীপুর জেলার রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২৯৭ জন এবং ১৬ সেপ্টেম্বর সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৮১৯ জন রোগী ছিলেন। প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে অন্তত দুজন করে স্বজন থাকায় প্রায় ১২ হাজার লোকের চাপ প্রতিদিন সামলাতে হচ্ছে।

জনবল কাঠামোতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালে অনুমোদিত ২ হাজার ২৮৬টি পদের মধ্যে ৩৫০টি শূন্য। সবচেয়ে বেশি সংকট চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে — ৪৬৪টি পদের বিপরীতে ২২১টি শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির ১৯৪টি পদের মধ্যে শূন্য ৬৭টি, আর ৪৬৬ চিকিৎসকের মধ্যে ৪০টি পদ খালি। এছাড়া ২০১৯ সালে চালু হওয়া সিটি স্ক্যান মেশিনটি গত মে মাসের শুরুর দিকে বিকল হয়ে গেছে। আগে এটি দিয়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি পরীক্ষা হতো, এখন রোগীদের বাইরে গিয়ে করাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, একজন চিকিৎসক যত রোগী দেখার কথা, বাস্তবে তাঁকে তার চেয়ে অনেক বেশি দেখতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে রোগী ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই, তাই সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত চাপ নিয়ে সেবা দিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এম ইকবাল হোসেইন গতকাল হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই সমস্যার সমাধান এক দিনে হবে না। ভবিষ্যতে কী করা দরকার, তা ঠিক করতে প্রকৌশলীদের বলা হয়েছে এবং এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।