সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান ঘুষ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এক অভিনব ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ। নিজের ও পরিবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তাড়িত হয়ে তিনি চালু করেছেন 'ঘুষ.সাইট' (ghush.site) নামক একটি ওয়েবসাইট, যেখানে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবায় ঘুষ দাবির অভিযোগ জানাতে পারছেন। গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মে মাত্র নয় দিনে (শনিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত) ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। জমা পড়া অভিযোগগুলোতে দাবি করা মোট ঘুষের পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকার মধ্যে বলে জানানো হয়েছে।

শাহেদের এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত শোক ও ক্ষোভ। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, যিনি ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের দাবি, মায়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে ট্রেজারি, জেলা শিক্ষা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে তাদের। এছাড়া কল্যাণ তহবিল ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য আরও ১০ লাখ টাকা পাওয়ার জন্য শিক্ষা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। টাকা না দিলে ফাইল সামনে বাড়বে না বলে সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু পারিবারিক বিষয় নয়, শাহেদ নিজেও ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করা শাহেদ অনলাইনে ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট শিখেছিলেন। ভারতের একটি অনুরূপ ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি মাত্র দুই ঘণ্টায় কোডিংয়ের মাধ্যমে এই সাইটের কাঠামো তৈরি করেন। পরে বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহায়তায় প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে ডোমেইন কিনে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। বর্তমানে শাহেদ কারিগরি দিক এবং সাইফ প্রচার ও বিপণনের কাজ সামলাচ্ছেন। অভিযোগগুলো যাচাই করতে তাদের চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম কাজ করছে।

আইনি জটিলতা এড়াতে বর্তমানে অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় বা অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে সরকারি সমর্থন বা আইনি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করতে পারলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ড্যাশবোর্ড যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। শাহেদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা আনা এবং ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনা, যেন সাধারণ মানুষ কোনো বাধা ছাড়াই তাদের প্রাপ্য সেবা পেতে পারেন। তিনি জানান, শুরুতে এটি কেবল তার সিভিতে যুক্ত করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু এটি যেভাবে ভাইরাল হয়েছে তা প্রত্যাশার বাইরে ছিল। তবে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো হুমকি পাননি।

এই ডিজিটাল উদ্যোগটি ইতিমধ্যে পুলিশের নজরে এসেছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, ঘুষের তথ্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তায় পুলিশ সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে। অন্যদিকে, সচেতন নাগরিক কমিটির ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান মনে করেন, এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশের দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসছে এবং সরকার নিজেই এমন স্বচ্ছ উদ্যোগ নিলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।

এদিকে, শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম তার ছেলের এই সাহসী পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী মজিবুর রহমান তাকে ১ লাখ টাকা ঘুষ দিতে বলেছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট অফিস সহকারী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন দ্রুত বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছেন।