কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের পুরাতন চড়াইকোলের বহলবাড়িয়া বিলে গত শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। শুক্রবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই দুই দিনের আয়োজনে বিলের পাড় ভরে উঠেছিল দর্শকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন। রংবেরঙের ডিঙি নৌকায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন মাঝিরা। বাঁশির তালে তালে সমান ছন্দে দাঁড় টানতে থাকেন তাঁরা, আর পাড়ে দাঁড়িয়ে দর্শকের করতালি ও ‘হেইও’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।

বিকেল গড়াতে থাকলে বিলের পাড়ে মানুষের ভিড় আরও বাড়ে। পানিতে সারি সারি নৌকা, মাথায় রঙিন গামছা বাঁধা মাঝিরা দাঁড় হাতে প্রস্তুত। ঢোল-কাঁসরের শব্দ আর উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নৌকা ছুটতে শুরু করলে দর্শকরা করতালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রায় তিন দশক ধরে এই আয়োজন চলছে। এবারের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখা, মানুষের বিনোদনের ব্যবস্থা করা এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের হাত থেকে দূরে রাখা।

প্রতিযোগিতা দেখতে আসা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র অন্তর বিশ্বাস বলেন, শহরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না। ছোটবেলায় দাদার কাছে বাইচের গল্প শুনেছেন। আজ তা নিজ চোখে দেখে খুব ভালো লাগছে। চড়াইকোল গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আজিবর মোল্লা জানান, শৈশবে এই বিলেই বাইচ খেলেছেন। মাঝখানে কয়েক বছর বন্ধ ছিল। আবার শুরু হওয়ায় পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে।

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ময়ূর নৌকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল মামুন ঢাকায় চাকরি করেন। খেলার জন্য গ্রামে এসেছেন। অনেক কষ্ট করে নৌকা সাজিয়েছেন। মানুষের এত সাড়া পাবেন ভাবেননি। তিনি প্রতিবছর এমন আয়োজনের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব ওয়াশিম আকরাম বলেন, গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ৩০ বছর ধরে বহলবাড়িয়া বিলে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। তরুণরা যেন খেলাধুলা ও সংস্কৃতির মধ্যে থাকে, মাদকের দিকে না যায়, সেজন্যই এই বাইচ। অন্তত ১০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছে। মানুষের সাড়া দেখে তারা অনুপ্রাণিত। সামনে আরও বড় করে আয়োজন করার ইচ্ছা আছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সাদী। তিনি বলেন, একটি বাইচ শুধু খেলা নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর মানুষের মিলনমেলা। এমন উদ্যোগ সারা জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।