নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের গল্প তুলে ধরতে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-৩’। সম্প্রতি প্রচারিত এক পর্বে অতিথি ছিলেন ‘ক্যাফে দোতলা’র প্রতিষ্ঠাতা নাসরিন নওরোজ স্বপ্না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় তিনি নিজের সংগ্রামী জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।

শুরুতেই গৃহিণী থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার কারণ জানতে চাইলে স্বপ্না বলেন, ছোটবেলা থেকেই নিজের একটি পরিচয় তৈরি করার স্বপ্ন ছিল তার। সংসারের পাশাপাশি কিছু করার তাগিদ থেকে তিনি ঘরেই পটারি ডেকোরেশনের কাজ শুরু করেন। স্বামী তাকে মাঝে মধ্যে সামান্য অর্থ দিতেন, যা দিয়ে তিনি রং ও পটারি কিনে নিজের মতো করে সাজাতেন। মাত্র দুই-তিন মাসেই তিনি বেশ কিছু পণ্য তৈরি করে ফেলেন। ২০১৩ সালে বৈশাখ উপলক্ষে নিজের হাউজিংয়ের নিচে এক মেলায় পণ্য বিক্রি করে তিনি সফলতার প্রথম স্বাদ পান, যা তাকে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা জোগায়।

২০২০ সালে তার জীবনে নেমে আসে এক কঠিন সংকট। স্বামীর দ্বিতীয় স্টেজের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং কেমোথেরাপির প্রতিক্রিয়ায় তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। করোনা মহামারির সেই সময়ে অসুস্থ স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয়েছে তাকে। এই দুঃসময়ে তার বাবাও মারা যান। চিকিৎসা শেষে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন হাতে ছিল না বলতে গেলে কিছুই। সন্তানদের ভরণপোষণ ও স্বামীর চিকিৎসা চালাতে ২০২১ সালে তিনি ‘স্বপ্না’স ফুড কর্নার’ নামে একটি অনলাইন পেজ খোলেন। সেখান থেকে অল্প অল্প আয় দিয়ে সংসার ও চিকিৎসার খরচ চালাতেন তিনি।

অনলাইনে ব্যবসা করে যখন সব খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তার খালাতো ভাইয়ের স্ত্রী তানজিনা নাহিদ এগিয়ে আসেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাদের ‘পোশাক বাই তাননাস’ আউটলেটের দোতলায় একটি রুম, বারান্দা ও কিচেনের জায়গা দিয়ে তিনি ক্যাফে শুরুর সুযোগ করে দেন। তানজিনা নাহিদ ও তার দুই বন্ধু নাসরিন শিকদার হেনা এবং আইরিন মাহমুদও তাকে নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করেন। ক্যাফে শুরুর জন্য হাতে মাত্র ৫ হাজার টাকা ছিল বলে জানান স্বপ্না। টেবিল, চেয়ার, ফ্রিজসহ প্রায় সবকিছুই দিয়েছেন তার এই বন্ধুরা। প্রায় এক বছর ধরে তারা এখনও তাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন, যা তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ‘ক্যাফে দোতলা বাই স্বপ্না’স ফুড কর্নার’ যাত্রা শুরু করে। শুরুতে কাস্টমার প্রায় ছিলেন না বললেই চলে। পরে তানজিনা নাহিদ ক্যাফের ভিডিও ইনস্টাগ্রামে প্রচার করলে ধীরে ধীরে কাস্টমার সংখ্যা বাড়তে থাকে। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে স্বপ্না বলেন, অর্থ না থাকলেও চেষ্টা থামানো যাবে না। সাহস ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে সফলতা মিলবেই। তিনি জানান, যখনই টাকার সংকট দেখা দিত, তখন দৈনিক উপার্জনের ৫০০ টাকা দিয়ে আবার বাজার করতেন। মুদি দোকান থেকে বাকিতে কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে কাজ চালিয়েছেন অনেক সময়।

ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তার বড় মেয়ে হোম ইকোনমিকসে ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশনে চতুর্থ বর্ষে পড়ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়ে সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তিন মেয়েই ক্যাফের কাজে তাকে সহযোগিতা করে থাকে। আলোচনার শেষে ‘আমার গল্প, আমার শক্তি’ ক্যাম্পেইনটি তার জীবনের একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট বলে উল্লেখ করেন স্বপ্না। এই ব্যবসায় টিকে থাকার মূল চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, খাবারের বৈচিত্র্য ও কাস্টমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ক্যাফেতে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া রয়েছে, যা অন্য ক্যাফে থেকে আলাদা করেছে।