ডেঙ্গু পরিস্থিতি যখন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় কীটনাশকের অভাবে পড়তে হলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির নিজস্ব মশার ওষুধের মজুত পর্যাপ্ত না থাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছ থেকে ১৬ হাজার লিটার মেলাথিয়ন কীটনাশক ধার নিতে হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর উত্তর সিটির গুদাম থেকে এই কীটনাশক নিয়ে যায় দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষ।

তবে ডিএসসিসির দাবি, এখন আর তাদের ওষুধের অভাব নেই। মশা নিধনের জন্য নির্ধারিত কীটনাশক হাতে পাওয়ার পর গত মঙ্গলবার থেকে নিজেদের কেনা ওষুধ দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। একইসঙ্গে উত্তর সিটির কাছ থেকে ধার নেওয়া কীটনাশক ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

কীভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে গত ২৪ আগস্টে। ওই দিন ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খয়বর রহমান উত্তর সিটির সিইও বরাবর একটি চিঠি পাঠান। সেখানে উল্লেখ করা হয়, মশা নিধনের জন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকে ২ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ডেলটামেথ্রিন কীটনাশক সরবরাহের কাজ চলছে, কিন্তু সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সময় লাগছে। পাশাপাশি মেলাথিয়ন সরবরাহের জন্যও আলাদা কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মশা নিধন কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্যই উত্তর সিটির কাছে ৭০ হাজার লিটার পরিপক্ব মশা নিধনের কীটনাশক (অ্যাডাল্টিসাইড) ধার চাওয়া হয়।

এই বিষয়ে খয়বর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ঠিকাদাররা মশার ওষুধ সরবরাহে দেরি করেন। পরে সেই ওষুধ পরীক্ষার জন্য পাঠাতেও বিলম্ব হয় এবং পরীক্ষার ফল পেতেও সময় লেগে যায়। তবে এখন ফল হাতে পাওয়ায় আর কোনো সংকট নেই। গত মঙ্গলবার থেকেই নিজেদের কেনা কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ সিটির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ১৬ হাজার লিটার মেলাথিয়ন দেওয়া হয়। গত ৩০ আগস্ট দক্ষিণ সিটির মনোনীত প্রতিনিধির কাছে এই কীটনাশক বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দুই দিন পর ১ সেপ্টেম্বর সেটি নিয়ে যায় ডিএসসিসি। উড়ন্ত ও পরিপক্ব মশা নিধনে ডিএনসিসি সাধারণত মেলাথিয়ন ইসি-৫ ব্যবহার করে থাকে। উত্তর সিটির তথ্যমতে, প্রতি লিটার মেলাথিয়নের দাম প্রায় ৪৫০ টাকা। সে হিসেবে ১৬ হাজার লিটার কীটনাশকের বাজারমূল্য প্রায় ৭২ লাখ টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সাধারণত পরিপক্ব মশা নিধনে ডেলটামেথ্রিন ও মেলাথিয়ন—এই দুই ধরনের কীটনাশকই ব্যবহার করে। ছয় মাস করে পালাক্রমে এই দুই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৫৭০ লিটার অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে উত্তর সিটি থেকে ধার নেওয়া ১৬ হাজার লিটার কীটনাশক দিয়ে মাত্র তিন থেকে চার দিনের মতো কাজ চালানো যেত।

কীটনাশক ধার দেওয়ার বিষয়ে ডিএনসিসির সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ সিটি যে পরিমাণ চেয়েছিল, তাদের চাহিদা বিবেচনা করেই তা সরবরাহ করা হয়েছে। দক্ষিণ সিটি ওই কীটনাশকের সমপরিমাণ টাকা সরাসরি ঠিকাদারকে দিয়ে দিলেই হবে। পরে ঠিকাদারের কাছ থেকে ওই পরিমাণ কীটনাশক নিয়ে উত্তর সিটি হিসাব সমন্বয় করবে।

এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৩১০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। আগস্ট মাসে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে—এক মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৮৪৬ জনে, যা প্রথম সাত মাসের মোট আক্রান্তের তুলনায় প্রায় ১৩৪ শতাংশ বেশি। আগস্টে মৃত্যু হয় ৯৭ জনের, যা জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বরেও এই ধারা অব্যাহত আছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ মাসে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৯২ জন, যা আগস্টের মোট আক্রান্তের প্রায় ৩১ শতাংশ।