প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কমে যাওয়ার ফলে বন্যপ্রাণী ও পাখিদের খাবারের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে শহর ও উপজেলা সংলগ্ন এলাকায় এই সমস্যা প্রকট। এই সংকট মোকাবিলায় এবং প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে বান্দরবনের টাইগারপাড়ায় এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন একদল তরুণ-তরুণী। তারা সেখানে গড়ে তুলেছেন একটি বিশেষ জুমখেত, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'পাখির জুম'।
বান্দরবান জেলা শহরের নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রের পাশে অবস্থিত এই ৬০ শতক পাহাড়ি জমিতে চাষ করা হয়েছে ধান, ভুট্টা, তিল-তিসি, মরিচ, মারফা, চিনার (জুমের বাঙ্গি) এবং আলুর মতো নানা ফসল। বর্তমানে এই খেতে ধানের শিষ বেরিয়েছে এবং ভুট্টাগাছে ফুল এসেছে। তবে এই কঠোর পরিশ্রমের ফসল মানুষের ভোগের জন্য নয়; বরং সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত থাকবে বন্যপ্রাণীদের জন্য। ধান ও ভুট্টা খাবে পাখিরা, আর বরবটি, শিম ও ঢ্যাঁড়সের মতো সবজি খাবে কাঠবিড়ালি ও ইঁদুর। এছাড়া বনের অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীরা খাবে আলু, মারফা এবং চিনারের মতো ফসল।
এই পুরো কার্যক্রমটি পরিচালনা করছে 'গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশন' নামক একটি সংগঠন। সংগঠনের সদস্যরা কোনো আর্থিক অনুদান ছাড়াই নিজেদের পরিশ্রমে বনের ঝোপঝাড় পরিষ্কার থেকে শুরু করে বীজ বপন এবং আগাছা দমনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পুসাইনু মারমা জানান, তাদের 'বাইয়োডাইভারসিটি কনজারভেশন' কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা। সমন্বয়কারী চসিংপ্রু মারমা উল্লেখ করেন, বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ায় প্রাণীরা হয় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অথবা খাবারের খোঁজে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে, যা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ।
প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করতে এবং ফসলের সমৃদ্ধি কামনা করে গত বুধবার এই তরুণরা মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী 'আবংমাহ (লক্ষ্মী) পূজা' পালন করেছেন। একজন পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে বাঁশের মাচাংয়ের ওপর ফল-ফুল ও মিষ্টান্ন সাজিয়ে এই ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করা হয়। পুরোহিত মংচিং মারমার মতে, আবংমাহ হলেন ধনের দেবী এবং তাঁর পূজা করলে ফসলের বরকত বাড়ে, যা পাহাড়ী মানুষের প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনদর্শনেরই একটি অংশ। বর্তমানে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে এই জুমখেতে প্রচুর পাখির আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।




