যুক্তরাষ্ট্রের কর্মজীবী জনগোষ্ঠী বর্তমানে মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের যে অংশ মজুরি হিসেবে পাচ্ছে, তা ১৯৪৭ সালে পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শ্রমিকদের আয়ের অংশ এখন ৫২.৮ শতাংশ — অথচ একই সময়ে কর্পোরেট মুনাফা আকাশচুম্বী। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৬০০ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে মজুরি বেড়েছে মাত্র ১২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও শ্রমিকরা সেই লাভের ক্রমশ কম অংশ পাচ্ছে — এই প্রবণতাকে অর্থনীতিতে বলা হয় 'লেবার শেয়ার' সংকোচন।
এই সংকোচনের বাস্তব প্রভাব এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সরকারি অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের (জিএও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আয়কারী কোম্পানি অ্যামাজনের ১২ হাজার ৩৪৬ জন কর্মী খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি (SNAP) এবং ১১ হাজার ৩৩৮ জন মেডিকেডের ওপর নির্ভরশীল — যা ২০২০ সালে অনুরূপ জরিপের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। ওই সময়ে অ্যামাজনের বার্ষিক মুনাফা ১১.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭৭.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির রাজস্ব আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৭১৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অ্যামাজনের পক্ষ থেকে অবশ্য এই পরিসংখ্যানকে 'ভুল' বলে মন্তব্য করা হয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র র্যাচেল লাইটি ফরচুনকে জানান, প্রকৃত তথ্য দেখলে বোঝা যায় অ্যামাজনের বেতন শিল্পে সেরাগুলোর মধ্যে একটি। নিয়মিত পূর্ণকালীন কর্মীদের প্রথম দিন থেকেই স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা মিলছে — সপ্তাহে মাত্র ৫ ডলার প্রিমিয়ামে। ৭৪ শতাংশ নিয়মিত কর্মী অ্যামাজনের স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত, যা বেসরকারি খাতের পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় ৬৫ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, অন্যান্য বড় খুচরা বিক্রেতাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অ্যামাজন তাদের মতো একই ধরনের প্রথম দিনের সুবিধা দিতে আহ্বান জানায়। তবে ফরচুনের অনুরোধে অ্যামাজন অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
শুধু অ্যামাজনই নয়, ওয়ালমার্ট, ফেডেক্স এবং রাইডশেয়ার ও ডেলিভারি কোম্পানিগুলোতেও ফেডারেল সহায়তা নেওয়া কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। জিএও-র শিক্ষা, কর্মী ও আয় নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ক্যাথরিন ল্যারিন ফরচুনকে বলেন, বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা জালের সুবিধা নিচ্ছেন এমন মানুষের অধিকাংশই কর্মজীবী, যাদের বেশিরভাগই পূর্ণকালীন কাজ করছেন। SNAP পাওয়ার আয়সীমা দারিদ্র্যসীমার প্রায় ১৩০ শতাংশ — অর্থাৎ অনেকে চাকরি করছেন, কিন্তু মৌলিক চাহিদা মেটানোর মতো আয় তাদের নেই। ল্যারিনের ভাষ্য, “এই বিশ্লেষণ মূলত দেখায় যে বিপুল সংখ্যক মানুষ অত্যন্ত কম আয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এরা এমন পরিবার, যারা খুব কষ্টে সংসার চালান, অথচ তারা কাজ করছেন, এবং অনেক কাজ করছেন।”
কেপিএমজি-র প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়াঙ্ক সম্প্রতি সতর্ক করেছেন যে শ্রম আয়ের অংশ সংকুচিত হওয়ার লুকানো পরিণতি রয়েছে। অর্থনৈতিক সূচক স্থিতিশীল মনে হলেও বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিক ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা সংকটে ভুগছেন। কেপিএমজি-র হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮২ সাল থেকে কর্পোরেট মুনাফা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৮৫ শতাংশ হয়েছে, অন্যদিকে কর্মচারী ক্ষতিপূরণের অংশ ৬৬.৬ শতাংশ থেকে কমে ৬১.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সোয়াঙ্ক সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, “আমার সাম্প্রতিক ইকোনমিক কম্পাসের এই চার্ট এখনও আমাকে ভাবায়। একজন বন্ধু এটাকে ‘বিপ্লবের চার্ট’ বলে ডাকে — যা বিরক্তিকর কিন্তু সত্য। বৈষম্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়ায়।”
কেন মার্কিন শ্রম আয়ের অংশ এমনভাবে ভেঙে পড়ল? এমআইটি স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক আনা স্ট্যান্সবেরি বলছেন, এই প্রবণতা প্রায় ৫০ বছর ধরে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ১৯৮৩ সালে ২০.১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ১০.০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, ফলে বেতন ও সুবিধা নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ কমেছে। তবে মূল কারণ তিনি মনে করেন কর্মক্ষেত্রের ‘ফিশারিং’ বা নিয়োগকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কের ভাঙন। আগে একটি কোম্পানি সরাসরি কর্মী নিয়োগ দিত, যেমন ব্যাংক অব আমেরিকা নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখত। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো খণ্ডকালীন বা ঠিকাদার কর্মী নিয়োগ করে, ফলে তাদের ইকুইটি বা সুবিধা দিতে হয় না। ঠিকাদার যদি শ্রম আইন ভাঙে, মূল কোম্পানি দায়ী নয়। এই পদ্ধতিতে কোম্পানিগুলো খরচ বাঁচায় এবং দক্ষতা বাড়ায় বলে যুক্তি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অধ্যাপক ব্রেন্ট নেইম্যান মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শ্রম আয়ের অংশ হ্রাসের প্রধান কারণ। নিউ ইয়র্ক টাইমসে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লেখেন, যারা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছেন তারা দেখতে পাচ্ছেন মানুষের করা অনেক কাজ এখন প্রযুক্তি দিয়ে করা সম্ভব। অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক জুলাইয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০১৫-২০২৫ সালের মধ্যে ৩২১টি পেশার মধ্যে যেগুলো এআই-এর উচ্চ সংস্পর্শে ছিল, সেগুলোর প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি ২০২৩ সালের পর ৬.৭ শতাংশ কমেছে — যদিও কর্মসংস্থান পরিবর্তিত হয়নি। অর্থাৎ এআই চাকরি নিচ্ছে না, কিন্তু মজুরি সংকুচিত করছে। কোম্পানিগুলো উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুযোগে দাম বাড়াচ্ছে, মজুরি স্থির রাখছে।
ভবিষ্যতে মজুরির গতি কী হবে, তা নিয়ে স্ট্যান্সবেরি বলেন, এআই-এর প্রভাব এখনও সামগ্রিক বাজারে দেখা যায়নি। বর্তমান সংকোচন সাময়িক চক্র নাকি দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা — তা বলা খুব তাড়াতাড়ি। মুদ্রাস্ফীতি যদি স্থিতিশীল থাকে এবং মজুরি বৃদ্ধি ফিরে আসে, তবে এটি চক্রাকার হতে পারে। কিন্তু যদি মজুরি নিম্নমুখীই থাকে এবং শ্রমবাজার শক্ত থাকা সত্ত্বেও শ্রম আয়ের অংশ কমতে থাকে, তাহলে এটি প্রকৃত কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।




