ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের একদল জীববিজ্ঞানী মানুষের মাথার খুলির ঠিক ভেতরে একটি অজানা রোগপ্রতিরোধক কেন্দ্রের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ জোনাথন কিপনিস। তাঁর সঙ্গে কাজ করেন সেল বায়োলজিস্ট জ্যাং হিউন পার্ক। দলটি জানিয়েছে, খুলির ভেতরের অস্থিমজ্জা শুধু কাঠামোগত সহায়তা দেয় না; এটি মস্তিষ্কের জন্য বিশেষায়িত প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের এক গোপন ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। এই ফলাফল নিউরোইমিউন মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে পারে।

দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল যে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র—অর্থাৎ মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ড—এবং শরীরের অন্যান্য অংশের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। এমনকি বাহ্যিক প্রতিরোধক কোষগুলো যদি কোনোভাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, তবে সেগুলো সংবেদনশীল স্নায়ুকোষের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে বলে মনে করা হতো। অথচ সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই ব্যবস্থার মধ্যে পূর্বে ধারণাকৃত সীমারেখা অনেকটাই ম্লান। মস্তিষ্ক ও খুলির অস্থিমজ্জার মধ্যে গভীর যোগাযোগের প্রমাণ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা ফ্লোরোসেন্ট চিহ্নিতকারী প্রোটিন ব্যবহার করে নিউরন থেকে খুলির হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত অণুর চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। এই পথগুলো বিশেষ কিছু কাঠামোর দিকে এগিয়ে যায়, যা লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থির মতো কাজ করে। লসিকা গ্রন্থি সাধারণত ইমিউন কোষের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। খুলির ঠিক ভেতরে এমন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত; কারণ এর মাধ্যমে মস্তিষ্ক বাইরের কোনো উৎস থেকে সৈন্য সংগ্রহ না করেই সরাসরি সামনের সারিতে লড়াই চালাতে সক্ষম হয়। পার্কের মতে, সুস্থ অস্থিমজ্জার অভ্যন্তরে এমন জটিল গঠন পূর্বে কখনোই পর্যবেক্ষণে আসেনি।

গ্লিওমা নামের এক মারাত্মক মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দলটি মাথার ত্বকের নিচে বিশেষ হাইড্রোজেল প্রয়োগ করে খুলির লিম্ফয়েড গঠন পরিবর্তন করে দেখেন। যেসব ইঁদুরের এই গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল, তাদের ক্যানসার আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং বেঁচে থাকার হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। অন্যদিকে, যেসব ইঁদুরকে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে—এমন তিনটি প্রোটিনের মিশ্রণ দেওয়া হয়েছিল, তাদের খুলির লিম্ফয়েড কোষগুলো শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে করে তারা ক্যানসারের সঙ্গে সফলভাবে লড়াই করে এবং তাদের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

যদিও ইঁদুরের ওপর চালানো এই পরীক্ষা মানুষের ক্ষেত্রে শতভাগ একই ফল দেবে কিনা, সে বিষয়ে আরও যাচাই প্রয়োজন। তবুও গবেষকরা জানিয়েছেন যে মানবদেহের খুলির অস্থিমজ্জাতেও ফলিকুলার টি সেলের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের মাথার ভেতরেও একই ধরনের গোপন সুরক্ষা কবচ লুকিয়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের বিকল্প হিসেবে খুলির ত্বকের নিচে সরাসরি হাইড্রোজেল ইঞ্জেকশন অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ ও সহজ হতে পারে।

জোনাথন কিপনিস মনে করেন, এই গবেষণা স্নায়ুবিজ্ঞান ও নিউরোইমিউনোলজির বর্তমান ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে। আলঝেইমার্স, পার্কিনসনস, সিজোফ্রেনিয়া এবং লং কোভিডসহ যেসব স্নায়বিক ও মানসিক রোগের পেছনে প্রতিরোধক্ষমতার সংযোগ রয়েছে, সেগুলোর চিকিৎসায় এই আবিষ্কার যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই নতুন জানালা ভবিষ্যতের চিকিৎসাপদ্ধতিকে আরও নির্ভুল ও কার্যকর করে তুলতে পারে। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট