মানুষের মনে আস্থার মাত্রা কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে। বিশেষত, মানুষ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন তার মানসিক প্রতিক্রিয়া কীভাবে গঠিত হয়—এটি এখন বিজ্ঞানীদের বিশেষ নজরে এসেছে। গবেষকরা দেখেছেন, মানুষের মনে একটি স্বাভাবিক পক্ষপাত কাজ করে, যাকে ‘মানব প্রিমিয়াম’ বলা হয়। অর্থাৎ, মানুষ সাধারণত অন্য মানুষের প্রতি বেশি আস্থা রাখে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি তুলনামূলক কম বিশ্বাস স্থাপন করে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘এআই পেনাল্টি’ নামক আরেকটি মানসিক প্রবণতা, যেখানে এআইকে মানুষের চেয়ে কম নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।

তবে এই চিত্র সবসময় একই রকম থাকে না। কখনো কখনো সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনাও ঘটে। পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষের মনে ‘এআই প্রিমিয়াম’ তৈরি হতে পারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হয়। একই সঙ্গে মানুষের প্রতি আস্থার মাত্রা কমে গিয়ে এক ধরনের ‘মানব পেনাল্টি’ দেখা দিতে পারে। গবেষণার মূল কথা হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রথম দেখায় যতটা সরল মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি জটিল ও প্রসঙ্গনির্ভর।

একটি চিন্তামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ধরুন, কোনো গ্রাহক একটি পণ্য ফেরত দেওয়ার জন্য একটি কোম্পানির গ্রাহক সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাকে একটি বার্তা পাঠানো হলো। যদি তাকে বলা হয়, এটি একজন মানব কর্মীর বার্তা, তবে তিনি হয়তো মাঝারি মাত্রার আস্থা নিয়ে কথোপকথন শুরু করবেন—কিছুটা আশাবাদী, কিছুটা সংশয়ী। কিন্তু যদি তাকে জানানো হয়, এটি আসলে একটি এআই-ভিত্তিক এজেন্টের বার্তা, তবে তার মানসিক প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বদলে যেতে পারে। বেশিরভাগ মানুষই তখন মনে করবেন, এআইয়ের সঙ্গে কথোপকথন কঠিন ও যান্ত্রিক হবে, যেখানে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক বেশি নমনীয় ও স্বাভাবিক।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মানুষের এই পক্ষপাত তখনও টিকে থাকে, যখন বাস্তবতার সঙ্গে তার ধারণা মেলে না। উদাহরণস্বরূপ, কাউকে যদি বলা হয় তিনি এআইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন, কিন্তু বাস্তবে অন্য প্রান্তে একজন মানুষ রয়েছেন—তাহলে তিনি নিজের মনে ‘এআই পেনাল্টি’ প্রয়োগ করবেন এবং কথোপকথনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন। উল্টো দিকে, যদি কাউকে বলা হয় তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, কিন্তু বাস্তবে এআই রয়েছে—তাহলে তিনি ‘মানব প্রিমিয়াম’ অনুযায়ী অতিরিক্ত আস্থা প্রদান করবেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মানুষের মন একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে আস্থার মাত্রা নির্ধারণ করে, এমনকি সেই ধারণা ভুল হলেও। গবেষণার ফলাফল দেখায়, একবার যদি কেউ মনে করে নেন তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, তবে পরবর্তীতে তাকে জানানো হলেও যে এটি আসলে এআই—তিনি তা বিশ্বাস করতে চান না। বরং তিনি মনে করেন, তাকে প্রথমে মিথ্যা বলা হয়েছিল, এখন আবার মিথ্যা বলা হচ্ছে। কারণ তার প্রথম ধারণা কথোপকথনের মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন, যাতে বোকা সাজতে না হয়।

এই মানসিক পক্ষপাতগুলো প্রসঙ্গভেদে বদলে যেতে পারে। কেউ যদি বারবার মানব গ্রাহক সেবার সঙ্গে খারাপ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন—যেখানে কর্মীরা অপ্রাসঙ্গিক কথায় সময় নষ্ট করেন—তাহলে তিনি মানুষের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে পারেন। অন্যদিকে, যদি তিনি এআই-ভিত্তিক সেবার মাধ্যমে সহজে ও দ্রুত পণ্য ফেরত দিতে সক্ষম হন, তবে তার মনে এআইয়ের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। ফলে তিনি ‘মানব পেনাল্টি’ ও ‘এআই প্রিমিয়াম’—এই দুটি মানসিক অবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।

গবেষকরা মনে করেন, মানুষের মনে চারটি ভিন্ন মানসিক অবস্থা থাকতে পারে: মানুষের প্রতি বেশি আস্থা ও এআইয়ের প্রতি কম আস্থা; মানুষের প্রতি কম আস্থা ও এআইয়ের প্রতি বেশি আস্থা; এবং এই দুইয়ের বিভিন্ন সংমিশ্রণ। তবে অনেক গবেষণায় শুধু প্রথম দুটি অবস্থার কথা বলা হয়, বাকি দুটি উপেক্ষিত থেকে যায়। বাস্তবে, মানুষের মনে আস্থার মাত্রা গতিশীল। এটি সময়ের সঙ্গে বদলায়, পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন রূপ নেয় এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

আজকের দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এতটাই উন্নত হয়ে উঠেছে যে, মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে তার পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে এআইয়ের কথোপকথন ছিল যান্ত্রিক ও সীমাবদ্ধ। কিন্তু এখন সাধারণ কথাবার্তায় এআই ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। ফলে মানুষের মনকে এখন এমন একটি বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে, যেখানে মানব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিথস্ক্রিয়া একই সঙ্গে ঘটছে।

এই প্রসঙ্গে দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের একটি উক্তি প্রাসঙ্গিক: “কোনো মানবিক সমস্যার দিকে পক্ষপাতহীন মন নিয়ে এগোনো সম্ভবত অসম্ভব।” গবেষকরা বলেন, এই পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতন হলেও তা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া যায় না। তাই সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এগুলোকে চিনতে পারা, নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাদের প্রভাব কমিয়ে আনা। সচেতনতাই প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।

সার্বিকভাবে, মানুষের মন এখন একটি দ্বিমুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মানুষ এআইয়ের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবে, তা শিখছে; অন্যদিকে তার নিজের মানসিক কাঠামোও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়, তবে গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে মানুষের আস্থার মানচিত্র আরও জটিল ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠবে।