সারা দেশে দুই দিন ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি বাতিল করেছেন ব্যবসায়ীরা। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারির মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান জানান, আগামী ২৯ অক্টোবর সকাল ১০টায় একটি গণশুনানির আয়োজন করে ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর আগে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দেশব্যাপী এলপিজি দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন সেলিম খান। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখা হতে পারে। তবে বুধবার সকালে সচিবালয়ে আমদানিকারক ও অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ব্রিফিংয়ে জ্বালানিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এলপিজি একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এবং এর সরবরাহ বন্ধ করে দাবি আদায়ের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৫৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, কর্মসূচি প্রত্যাহার না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবে সরকার।
একই বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উল্লেখ করেন যে, ব্যবসায়িক লাভ-লোকসান বা কমিশনের সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব এবং কর্তৃপক্ষ তা শুনতে প্রস্তুত। তবে ব্যবসায়িক স্বার্থে বাজার পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে দেশকে জিম্মি করার কোনো চেষ্টা সরকার মেনে নেবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রধান দাবি হলো, প্রতিটি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ করা। তারা জানান, পাঁচ বছর আগে বিইআরসি প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল, কিন্তু বর্তমানে পরিবহন, শ্রমিক মজুরি, গুদাম ভাড়া ও লাইসেন্স ফি বাবদ খরচ বহুগুণ বেড়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানি থেকে গুদাম পর্যন্ত আনতে ৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে ৩৫ টাকা এবং বেতন ও গুদাম ভাড়া বাবদ ২৫ টাকা খরচ হয়। এর সাথে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করে তারা মোট ১৫০ টাকা কমিশন দাবি করেছেন।
এছাড়া সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—মাসিক দাম ঘোষণার পর কোম্পানির একক সিদ্ধান্তে দাম পরিবর্তন না করা, চালানে প্রকৃত দাম লেখা, সঠিক পরিবহন ভাড়া প্রদান এবং দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বাজারে ছাড়া। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, ঋণপত্র খুলতে না পারায় অনেক কোম্পানির লাখ লাখ সিলিন্ডার পড়ে আছে। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অযৌক্তিক জরিমানা ও হয়রানি বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম রোধে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সক্রিয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম ও সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে চেষ্টা চলছে এবং আগামী ৩০ অক্টোবর অপারেটরদের সাথে পুনরায় বৈঠক হবে। এর আগেও গত ৮ জানুয়ারি একই ধরনের ধর্মঘটের ঘটনা ঘটেছিল, যা বিইআরসির আশ্বাসের পর প্রত্যাহার করা হয়।




