মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সোমবার দেশটির বিমানবাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তা ট্রয় মেইঙ্ক মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে জানান, মার্কিন বাহিনীকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এই কক্ষপথের অস্ত্র অপরিহার্য। তবে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র পাঠানো হয়েছে, তার ক্ষমতা বা কবে তা মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে—এসব বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি।
১৯৫৭ সালে মহাকাশ যুগের সূচনার পর থেকেই বিভিন্ন দেশ মহাকাশে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গোপনে সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে আসছে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি মূলত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা রেডিও জ্যামিং প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। ডারহাম ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোপলিটিকসের সহযোগী অধ্যাপক ও রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো ব্লেডিন বোয়েনের মতে, এটি একটি অ-ধ্বংসাত্মক অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র, যা কৃত্রিম উপগ্রহের রেডিও যোগাযোগ নিষ্ক্রিয় করে দিতে সক্ষম।
এদিকে চীন ইতিমধ্যে এমন একটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে যার মাধ্যমে একটি যান অন্য স্যাটেলাইটকে ভিন্ন কক্ষপথে নিয়ে যেতে পারে। এই প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও রয়েছে—মহাকাশে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করাও সম্ভব। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মহাকাশে এ ধরনের অস্ত্র মোতায়েনের ফলে বড় ধরনের ধ্বংস ও বর্জ্য সৃষ্টির ঝুঁকি থেকেই যায়। কাইনেটিক কিল ভেহিকেলের মাধ্যমে একটি যান অন্য স্যাটেলাইটকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ধ্বংস করে দিতে পারে। অন্যদিকে ক্লোজ ইন্সপেকশন ও গ্র্যাপলিং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কোনো স্যাটেলাইটকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ বা ধরে ফেলা সম্ভব।
রাশিয়া ও চীন অতীতে এমন কোনো অস্ত্র মহাকাশে ব্যবহার করেছে কি না—তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে জার্মানির বিজ্ঞান ও রাজনীতি ফাউন্ডেশনের গবেষক জুলিয়ানা সুয়েস জানিয়েছেন, রাশিয়া আগে কো-অরবিটাল অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া ও চীন মহাকাশে রেনডেভু ও প্রক্সিমিটি অপারেশন (আরপিও) নামের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিংস কলেজ লন্ডনের রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক রড থর্নটনের মতে, মহাকাশে কিছু স্যাটেলাইট হান্টার-কিলার হিসেবে কাজ করতে পারে—যেগুলো সামান্য ধাক্কা দিয়ে বা ধাক্কা খেয়ে অন্য স্যাটেলাইটকে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, মার্কিন এই ঘোষণা মূলত একটি রাজনৈতিক সংকেত, যেখানে নতুন কোনো প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চেয়ে বার্তাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সামরিক আধুনিকায়ন ও মহাকাশে তাদের স্যাটেলাইট সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিয়েছে। বর্তমানে মার্কিন ও চীনা—উভয় পক্ষই একে অপরের মহাকাশ কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই মহাশূন্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।




