ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে তেহরানের কাছে বিশেষ সহায়তা চেয়েছে চীন। সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির সংলগ্ন এলাকায় হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও নৌ-চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই সংকটের মুখে রিয়াদ বেইজিংয়ের শরণাপন্ন হলে, চীন একান্তে ইরানের কাছে তাদের প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার অনুরোধ জানায়। তিনটি ইরানি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বেইজিং চায় না যে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলোতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ুক। যদিও চীন প্রকাশ্যভাবে সংলাপ এবং নৌপথে নিরাপদ চলাচলের কথা বলেছে, তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, তেহরানকে দেওয়া গোপন বার্তায় এর চেয়েও জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এই বার্তাটি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

চীনের এই উদ্যোগের জবাবে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের সংঘাত বন্ধ না হলে এই অঞ্চলে প্রকৃত শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসা সম্ভব নয়। তবে চীনা কর্মকর্তারা তেহরানকে কোনো সরাসরি হুমকি দেননি কিংবা হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার কোনো ইঙ্গিতও দেননি। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা কোনো পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা করবে না, তাই সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান জানিয়ে সংঘাত বন্ধ করা জরুরি।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা। ২০২৫ সালের তথ্যানুসারে, ইরান সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনেছে, যার গড় পরিমাণ ছিল দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল। একজন জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, বিশ্বে খুব কম দেশই ইরানকে প্রভাবিত করতে পারে, আর চীন তাদের মধ্যে অন্যতম। হুতিরা বর্তমানে ইরানের ইসরায়েল-বিরোধী 'প্রতিরোধ অক্ষ'-এর অংশ, যা হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তাকে একই সাথে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা মনে করেন, বেইজিং হয়তো ওয়াশিংটনের চাপের বিরোধিতা করবে, কিন্তু তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ অনেক বিস্তৃত। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের দেশগুলোর সাথে চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার। ফলে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তবে শেষ পর্যন্ত চীনের নিজস্ব স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইরানের জন্য চীনের সাথে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত ইরানি অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সক্ষমতা চীনের মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশেরই আছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে চীন মধ্যস্থতা করলেও, তাদের প্রভাবের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তির পর তেলবহির্ভূত খাতে বিনিয়োগ কম হওয়ায় ইরানের ভেতরে চীনের সমালোচনা হয়েছে। বর্তমানে তেহরান ও বেইজিং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হলেও, শেষ পর্যন্ত চীন বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নিয়ে ইরানের ওপর প্রভাব খাটাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।