মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে আবদুল গনি একাডেমির দেয়াল ঘেঁষে একটি ছোট টিনের চালার সেলুন। বাইরে ব্যানারে লেখা 'বাবলু সেলুন'। ভেতরে চারটি কাঠের চেয়ার আর আয়নার নিচের বেঞ্চে সাজানো কিছু বই। এই সাধারণ সেলুনটির মালিক নরসুন্দর বাবলু কুমার বিশ্বাস (৫৮), যার জীবন কাটে কাঁচি-চিরুনি আর বইয়ের পাতায়। দুপুরে যখন কোনো গ্রাহক থাকে না, তখন তিনি একমনে ডুবে থাকেন সাহিত্যের জগতে। সম্প্রতি তাকে দেখা গেছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিপ্রদাস’ উপন্যাস পড়তে, তবে গ্রাহক আসামাত্রই তিনি বই বন্ধ করে কাজে মন দেন।
বাবলু কুমারের জন্ম মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার বরিশাট গ্রামে। অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং মাত্র ১২ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে তিনি সেলুনের কাজ শুরু করেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত শ্রীপুরের খামারপাড়া বাজারে কাজ করার পর ১৯৮৫ সালে তিনি মাগুরা শহরে চলে আসেন। শহরের বিভিন্ন স্থানে সেলুন চালানোর পর এখন এই ছোট টিনের চালাতেই তাঁর স্থায়ী কর্মস্থল।
বইয়ের প্রতি তাঁর টান ছোটবেলা থেকেই। ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’ পড়ার পর তিনি অনুভব করেন, লেখক যেন তাঁর চারপাশের মানুষেরই গল্প বলছেন। এরপর তিনি শরৎচন্দ্রের একের পর এক উপন্যাস পড়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং সমরেশ বসুর বই পড়েন। সর্বশেষ তিনি শরৎচন্দ্রের ‘শেষ পরিচয়’ এবং ‘শেষ প্রশ্ন’ উপন্যাস দুটি শেষ করেছেন।
নিজের এই জ্ঞান ও আনন্দ তিনি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পছন্দ করেন। একসময় তাঁর সংগ্রহে প্রায় ১৫০টি বই ছিল, যার অনেকগুলো তিনি বইপ্রেমী গ্রাহক ও পরিচিতদের উপহার দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর কাছে ৩২টি বই রয়েছে। নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠাগারে ২৫টি বই দান করেছেন বলে জানান ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহেদী হাসান।
বাবলুর গ্রাহকদের অনেকেই তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত। সরকারি চাকরিজীবী ইকবাল তালুকদার জানান, ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি বাবলুর কাছে চুল কাটান এবং সেখানে বসে বই পড়ে সাহিত্যের আলোচনা করেন। তাঁর মতে, প্রথাগত শিক্ষা কম হলেও সাহিত্যের বিষয়ে বাবলুর ধারণা অত্যন্ত গভীর। একইভাবে মাগুরা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক তানভীর রহমান জানান, নব্বইয়ের দশক থেকেই তিনি বাবলুকে চেনেন এবং সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথা জানান।
সাহিত্যের পাশাপাশি গানের প্রতিও বাবলুর প্রবল অনুরাগ রয়েছে। লোকসংগীতের সাধক বিজয় সরকারের গানের ভক্ত তিনি এবং তাঁর অনেক গানই মুখস্থ বলে জানান দীর্ঘদিনের গ্রাহক ও সাংবাদিক রবিন শামস।
সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও নিজের জীবন নিয়ে বাবলু কুমারের কোনো আক্ষেপ নেই। নিজের উপার্জনে সংসার চালানো এবং কারও কাছে ঋণী না থাকাকেই তিনি জীবনের বড় প্রাপ্তি মনে করেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। জীবনের দর্শন সম্পর্কে তিনি বলেন, বড় কোনো লোভ না করে মানুষের ভুলত্রুটি মেনে নিয়েই এগিয়ে চলা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের কথা বা আচরণের মাধ্যমে যেন অন্য কোনো মানুষ কষ্ট না পায়।




