চীনের সিচুয়ান প্রদেশের রাজধানী চেংদু শহরটি তার নিজস্ব এক ছন্দে চলে। এই শহরের অভিজ্ঞতাকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—প্রকৃতির আদুরে পান্ডা, ইতিহাসের প্রভাবক মাও সে-তুং এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী কোয়ানঝাই অ্যালি।

শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চেংদু রিসার্চ বেজ অব জায়ান্ট পান্ডা ব্রিডিং’। এটি পান্ডাদের সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রজননের একটি বিশাল কেন্দ্র। এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত সবুজ এবং ছায়াঘেরা। তপ্ত আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ পান্ডাকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ইনডোর এনক্লোজারে দেখা যায়। পান্ডাদের জীবন অত্যন্ত শান্ত ও ধীরগতির; তাদের দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে বাঁশ খাওয়া এবং ঘুমানোর মাধ্যমে। বাঁশে পুষ্টি কম হওয়ায় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তারা এই অলস জীবনযাপন করে, যা আসলে তাদের বেঁচে থাকার এক বিশেষ কৌশল। এই সাদা-কালো প্রাণীদের নির্বিকার ভঙ্গি এবং প্রশান্তি দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় যে, সবসময় তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই; ধীরলয়ে চললেও জীবন থেমে থাকে না। এছাড়া এখানে প্রাণবন্ত লাল পান্ডাদেরও দেখা মেলে, যারা গাছের ডালে চড়তে এবং পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে।

প্রকৃতির এই শান্ত জগৎ থেকে বেরিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে তিয়েনফু স্কয়ারে পৌঁছলে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত নেতা মাও সে-তুংয়ের এক বিশাল ভাস্কর্য। একদিকে পান্ডাদের কোমলতা আর অন্যদিকে মাও-এর রাজনৈতিক শক্তির এই বৈপরীত্য চেংদু শহরের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মাও সে-তুংয়ের নেতৃত্বে চীনা বিপ্লব এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠা আধুনিক চীনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল, যার প্রতিফলন ঘটে এই বিশাল মূর্তির মাধ্যমে।

দিনের শেষ ভাগে লেখক ঘুরে দেখেন কোয়ানঝাই অ্যালি। এর অর্থ হলো ‘প্রশস্ত ও সরু গলি’। এটি মূলত কিং রাজবংশের সময়ের মানচু সৈন্যদের বসতির তিনটি সমান্তরাল গলির সমষ্টি। এখানে প্রাচীন ইটের দেয়াল, কাঠের দরজা এবং ঐতিহ্যবাহী উঠোনবাড়ির কাঠামো এখনও preserved আছে। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই পুরোনো গলিগুলোতে এখন গড়ে উঠেছে নানাবিধ ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকান। এখানে প্রাচীন স্থাপত্য আর আধুনিক নাগরিক জীবনের এক চমৎকার সংমিশ্রণ দেখা যায়। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে এই গলিগুলো হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত, যেখানে স্থানীয় খাবার এবং চায়ের আড্ডায় সময় কাটে পর্যটকদের।

পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে লেখক উপলব্ধি করেন যে, জীবনকে কেবল দ্রুতবেগে ছুটে দেখার চেয়ে মাঝে মাঝে থেমে যাওয়া এবং ধীরলয়ে অনুভব করা অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক। পান্ডাদের জীবন তাকে শিখিয়েছে বিশ্রাম নিতে, মাও-এর মূর্তি তাকে ভাবিয়েছে ইতিহাস নিয়ে এবং কোয়ানঝাই অ্যালি তাকে মুগ্ধ করেছে তার ঐতিহ্য দিয়ে। এই অনুভূতির প্রভাবে তিনি তার পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা বাতিল করে এক দিন ধীরলয়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন।