মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধ অভিযানে নিহত বিমানবাহিনীর এক সদস্যের স্ত্রী জানিয়েছেন, তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পরও তার প্রাপ্য ভাতা ও মূল বেতন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের জন্য একটি ভাইরাল সামাজিক মাধ্যম পোস্টের সাহায্য নিতে হয়েছে। ৩৩ বছর বয়সী মেজর অ্যালেক্স ক্লিনার মার্চ মাসে পশ্চিম ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ছয় ক্রু সদস্যের একজন। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালীন এই দুর্ঘটনা ঘটে। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৯০ জন আহত হয়েছেন।
তার স্ত্রী লিবি ক্লিনারের সঙ্গে এ সপ্তাহে যোগাযোগ করে বিমানবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, তার স্বামীর চূড়ান্ত বেতন চেকে হ্যাজার্ড পে এবং যুদ্ধ সংক্রান্ত কর ছাড় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর আগে তার স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে সহায়তার জন্য নিয়োজিত এক সামরিক অফিসার জানিয়েছিলেন, ‘আমরা যুদ্ধে নেই’ বলে এই সুবিধাগুলোর জন্য তিনি অযোগ্য। সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই বিমানবাহিনীর এই পদক্ষেপ।
লিবি ক্লিনার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “আমার স্বামী যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন কারণ আমরা একটি যুদ্ধে আছি, কিন্তু আমাকে বলা হলো প্রযুক্তিগতভাবে এটি যুদ্ধ নয় বলে আমরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হব। পুরো ব্যাপারটাই নীতির প্রশ্ন।” তার এই পোস্ট গত সপ্তাহান্তে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের এক ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার ঘটনা খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দেন। ভ্যান্স বলেন, “আমরা যতটা সম্ভব সহায়ক হতে চাই এবং নিশ্চিত করতে চাই যে তিনি যা পাওয়ার অধিকারী তা সবই পান। তাকে বলতে চাই, আমরা আপনাকে ভালোবাসি, আপনার আত্মত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞ এবং যা প্রয়োজন তা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে আমরা খুব গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছি।”
একটি পৃথক প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে যুদ্ধ অভিযান বর্ণনা করার জন্য ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, “সেখানে কোনো সক্রিয় গোলাগুলি নেই।” তবে এই সপ্তাহেই ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে দুই দফা বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, এবং ইরান পাল্টা গালফ অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর গোলাবর্ষণ করেছে। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন হামলাকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ বলে অভিহিত করেন এবং ভ্যান্সের মন্তব্যকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, “আমি একে সামরিক সংঘাত বলি কারণ আমাদের কাছে এটি ছোটখাটো বিষয়।”
জুলাইয়ের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে নতুন করে যুদ্ধে নিহত ও আহতদের জন্য পেন্টাগনের হতাহতের গণনা পদ্ধতিতে একটি নতুন পৃথক বিভাগ তৈরি করে। পেন্টাগন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের মূল নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। ৭ জুলাই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সব হতাহত ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ নামে তালিকাভুক্ত হচ্ছে।
লিবি ক্লিনার জানান, এ সপ্তাহে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা তার সাথে যোগাযোগ করে স্বামীর বেতন পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। বৃহস্পতিবার বিমানবাহিনী স্বীকার করে যে, প্রাথমিকভাবে তাদের দেওয়া তথ্য সঠিক ছিল না এবং তার স্বামীর প্রাপ্য সম্পূর্ণ বেতন ও সুবিধা তিনি পাচ্ছেন তা নিশ্চিত করে। তাকে জানানো হয়, তার স্বামীর বেতন চেকে যুদ্ধ সংক্রান্ত হ্যাজার্ড পে ও কর ছাড় আগেই অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে তা সঠিকভাবে তালিকাভুক্ত হয়নি। সামরিক ওয়েবসাইট অনুযায়ী ‘কমব্যাট পে’ নামে পরিচিত এই মাসিক ২২৫ ডলারের সুবিধা কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; সেনা সদস্য যদি এমন এলাকায় থাকেন যেখানে ‘শারীরিক আঘাতের মারাত্মক ঝুঁকি’ রয়েছে বা ‘শত্রুপক্ষের গোলাগুলির ঘটনায় নিহত, আহত বা জখম’ হন, তাহলে তা প্রযোজ্য। অ্যালেক্স ক্লিনারের চূড়ান্ত বেতন চেকে এই সুবিধার অর্ধেক পরিমাণ থাকার কথা, কারণ সেনারা মাসে দুই কিস্তিতে বেতন পান। ক্লিনার তার স্বামী কত টাকার কর ছাড় পেতেন তা নির্দিষ্ট করে বলেননি। তিনি জানান, তাকে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল যে, আলাবামার বার্মিংহামের এই আট বছরের বিমানবাহিনী অভিজ্ঞ তার স্বামী এই সুবিধার অযোগ্য, কিন্তু সেই অর্থের পরিমাণ তিনি প্রকাশ করেননি।
বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা ক্লিনারের সাথে কথা বলেছে “তার সব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর দেওয়ার” জন্য এবং নিশ্চিত করেছে যে তার স্বামীর বেতনে “সব যোগ্য যুদ্ধাঞ্চল সুবিধা অন্তর্ভুক্ত” ছিল। বিমানবাহিনী আরও বলেছে, “আমরা ক্লিনার এবং কেসি-১৩৫ দুর্ঘটনায় নিহত সব বিমানবাহিনী সদস্যের পরিবারকে স্পষ্ট তথ্য এবং অব্যাহত সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
সামরিক বাহিনীতে বেতন সংক্রান্ত ত্রুটি খুব সাধারণ বিষয়, কারণ কর্মীদের স্থাপনার অবস্থা, দায়িত্বের স্থান বা এমনকি পারিবারিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের অর্থপ্রদানের যোগ্যতা পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে বেসামরিক কর্মীদের তুলনায় কিছু সেনা সদস্য বছরে অনেকবার তাদের বেতন চেকে পরিবর্তন দেখতে পারেন, যা ত্রুটির সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়।
লিবি ক্লিনার এবং তার তিন সন্তানের জন্য তার স্বামীর মৃত্যুর পর শুরু হওয়া একটি গোফান্ডমি তহবিলে এখন ১৫ লাখ ডলারের বেশি জমা হয়েছে। ক্লিনার বলেন, তিনি আশা করেন যে, তার মুখ খোলার মাধ্যমে অন্যান্য শোকাহত পরিবারগুলো শুরু থেকেই স্পষ্ট তথ্য পাবে। তিনি বলেন, “আমি ভাগ্যবান যে আমার চারপাশে একটি বড় সহায়তা ব্যবস্থা আছে এবং নিজের ও সন্তানদের জন্য কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম আছে। অন্যান্য পরিবারের কাছে এই সংস্থান নাও থাকতে পারে। আমি যদি এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অন্য কারও জন্য একটু সহজ করতে পারি, তাহলে আমি তা করতে প্রস্তুত।”




