যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নীতি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে তীব্র ফাটল দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এখন যুদ্ধের দায়ভার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক দীর্ঘ পোস্টে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই সংঘাতই তাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ এবং প্রেসিডেন্ট নিজেও এই বিষয়ে কথা বলেছেন। দীর্ঘকাল ইরানবিরোধী হিসেবে পরিচিত সেনেটর টেড ক্রুজও তাঁর পডকাস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, এই যুদ্ধ দ্রুত ও চূড়ান্তভাবে শেষ হওয়া উচিত ছিল। তবে এসব সমালোচনার মুখেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ট্রাম্প 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-কে জানান, তিনি সঠিক কাজই করেছেন এবং পুনরায় সুযোগ পেলেও একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ চলছে, তাই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড় এখনই শুরু হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত জে ডি ভ্যান্স এবং ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতো নেতারা এখন ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। ভ্যান্সের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং ২০২৪ সালের ট্রাম্প সমর্থক ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার ডেমোক্র্যাটদের বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে, টেড ক্রুজ অভিযোগ করেছেন যে যুদ্ধটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। গত জুনে তেহরানের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের প্রস্তাব ছিল, যা রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা প্রত্যাখ্যান করায় চুক্তিটি ভেস্তে যায়। বর্তমানে এই যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
কাতার জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ এবং এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেটের মতে, রিপাবলিকান নেতাদের এই অবস্থান পরিবর্তন মূলত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তাঁরা মনে করছেন, ট্রাম্পের অন্ধ অনুসরণ এখন তাঁদের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভ্যান্স আন্তর্জাতিক সংঘাত এড়িয়ে চলার পক্ষে এবং ট্রাম্পের মূল সমর্থক গোষ্ঠীকে পুনরায় নিজেদের দিকে টানতে চান।
এদিকে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা এখন ইরানে সামরিক অভিযানের অর্থায়ন বন্ধ করার পরিকল্পনা করছেন। সেনেটের নেতা চাক শুমার এবং প্রতিনিধি রো খান্না যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বাজেট নিয়ন্ত্রণ করার কথা জানিয়েছেন, যা অনেকটা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কংগ্রেসের পদক্ষেপের মতো। এর ফলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তীব্র চাপের মুখে পড়তে পারেন এবং তাঁকে যুদ্ধের হিসাব দিতে হতে পারে। অধ্যাপক মাসগ্রেভ সতর্ক করেছেন যে, প্রশাসন যদি কংগ্রেসের বাজেট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তবে তা বড় ধরনের সাংবিধানিক লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা থামেনি। নির্বাচনের দিনও হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী এবং পশ্চিম এশিয়ায় তিনটি রণতরী মোতায়েন রাখা হয়েছে। যদিও কাতারের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চলছে, তবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু জবাবকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে মনে করছে। গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও ক্যাফিয়েরো মনে করেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা না পাওয়া পর্যন্ত ট্রাম্প আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে 'দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস'-এ ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর আপাতত বড় কোনো হামলার পরিকল্পনা নেই।




