২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে 'মন্যুমেন্ট আ লা রিপাবলিক'-এ ফরাসি পতাকার বদলে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে একদল তরুণ। এই ঘটনার পর পুরো ফ্রান্সে প্রায় ১৪০টি বিক্ষোভ সমাবেশ ঘটে এবং রাস্তায় নেমে আসেন প্রায় ৩২ হাজার মানুষ। মার্সেইয়ের টাউন হল এবং লিয়নের টুরিস্ট অফিসে অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যার ফলে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করতে হয়। যদিও এই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল শিক্ষক সংকট এবং ভেঙে পড়া স্কুল ভবনের প্রতিবাদে, কিন্তু খুব দ্রুতই তা ফিলিস্তিন ইস্যুর মোড় নেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভগুলোর পেছনে কেবল নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক কারণ নেই, বরং এটি একটি গভীরতর সামাজিক ও মানসিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও কেন তরুণরা এই পতাকাকে বেছে নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিরিয়া বা সুদানের মতো ভয়াবহ মানবিক সংকটের চেয়ে ফিলিস্তিন ইস্যু এখানে একটি 'আবেগের বহিঃপ্রকাশ' বা 'ভেসেল' হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে তরুণরা তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ, হতাশা এবং সিস্টেমের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছে।

এই অস্থিরতা কেবল ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ নয়; বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজ এবং ইতালির তুরিন ও মিলানেও একই ধরনের ছাত্র বিক্ষোভ ও লুটতরাজের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্রেও এই ধরণের অসন্তোষের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে গত ২০ বছরের ভুল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক চাপ। লক্ষ লক্ষ তরুণ উচ্চমূল্যের ডিগ্রি নিয়েও উপযুক্ত বেতনভুক্ত চাকরির নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দ্রুত উত্থান তাদের মনে এই ভয় তৈরি করেছে যে, অদূর ভবিষ্যতে তাদের পেশাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ইতিহাসের সাথে তুলনা করে বলা হচ্ছে, শিল্প বিপ্লবের সময় যেভাবে কৃষিভিত্তিক জীবন পরিবর্তিত হয়েছিল এবং এক প্রজন্মের পরিচয় সংকট তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে এআই-এর প্রভাবে জ্ঞানভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তরুণরা যখন অনুভব করে যে এই ব্যবস্থায় তাদের কোনো মূল্য নেই বা তারা গুরুত্ব পাচ্ছে না, তখন তারা এমন কোনো আন্দোলনে যোগ দেয় যা তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনুভব করায়। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের আন্দোলনগুলো বাহ্যিক শক্তির প্ররোচিত হতে পারে, যেমন রাশিয়া বা চীনের মতো দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্বে এই অস্থিরতা বাড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে এই অন্ধকারের মাঝে আশার আলোও রয়েছে। লেখক মনে করেন, আমরা এখন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত দশকের শুরুতে দাঁড়িয়ে আছি। ফিউশন এনার্জি, এআই-চালিত চিকিৎসা বিজ্ঞান (যেমন ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং জিন থেরাপি), এবং থ্রিডি-প্রিন্টিং হাউজিংয়ের মতো উদ্ভাবনগুলো আগামী দিনে জীবনযাত্রার মান নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সম্ভাবনাগুলোকে একটি 'মিশন' হিসেবে তরুণদের সামনে উপস্থাপন করতে পারছে না। ১৯৬২ সালে জন এফ কেনেডি যেভাবে চাঁদে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে এক পুরো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তেমন কোনো দূরদর্শী লক্ষ্য এখনকার নেতাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে না।

পরিশেষে বলা যায়, প্যারিসের রাস্তায় থাকা তরুণরা শত্রু নয়, বরং তারা বর্তমান ব্যবস্থার ব্যর্থতার লক্ষণ। যদি নেতৃত্ব তাদের সামনে একটি উজ্জ্বল ও বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারে, তবেই এই ধ্বংসাত্মক ক্রোধ প্রশমিত হবে। অন্যথায়, সঠিক দিশা না পেলে তরুণরা আরও অনেক 'পতাকা' বা কারণ খুঁজে নেবে কেবল সিস্টেমের প্রতি তাদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের জন্য।