বহুতল ভবনের লিফটে পা রাখার মুহূর্তেই অনেকের মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি কোনো যন্ত্রাংশের ত্রুটি নয়; বরং পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতির সরাসরি ফল। লিফটের চারদিকের ধাতব কাঠামো একটি বিশেষ ঘের তৈরি করে, যা বাহ্যিক তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গকে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা ‘ফ্যারাডে কেজ’ তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত করেন।
এই ধারণার উৎস ১৮৩৬ সালে। ব্রিটিশ পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ মাইকেল ফ্যারাডে তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন, কোনো পরিবাহী বস্তুর অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চার্জ কেবল তার বাইরের পৃষ্ঠে অবস্থান করে এবং ভেতরের অংশে কোনো প্রভাব ফেলে না। নিজের এই ধারণা যাচাই করতে তিনি ধাতব ফয়েল দিয়ে একটি বিশেষ কক্ষ বা খাঁচা নির্মাণ করেন। এরপর বাইরে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ-সংযোগ দেন। তাঁর সেই পরীক্ষামূলক আবিষ্কার থেকেই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ফ্যারাডে কেজ ধারণার জন্ম হয়। এটি মূলত এমন একটি পরিবাহী ধাতব বেষ্টনী বা খাঁচা, যা বাইরের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র বা তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গকে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এর ভেতরের অংশ সব সময় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে এবং বাইরের কোনো বৈদ্যুতিক প্রভাব সেখানে পৌঁছাতে পারে না।
স্মার্টফোন সচল রাখার জন্য বা কল আসার জন্য তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের প্রয়োজন হয়। আর এই তরঙ্গ চলাচলের জন্য বৈদ্যুতিক চার্জ অত্যন্ত জরুরি। লিফটগুলো সাধারণত চারপাশ থেকে ধাতু দিয়ে ঘেরা থাকে, যা একটি নিখুঁত ফ্যারাডে কেজ হিসেবে কাজ করে। লিফটের দরজা যখন খোলা থাকে, তখন ফাঁক দিয়ে কিছু সিগন্যাল প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু দরজা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সেই ফাঁকও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ধাতব বেষ্টনীটি বাইরে থেকে আসা সব তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ আটকে দেয়। ফলে লিফটের ভেতরের অংশটি একপ্রকার সুরক্ষিত খাঁচার মধ্যে পরিণত হয়, যেখানে কোনো নেটওয়ার্ক বা চার্জ পৌঁছাতে পারে না এবং মোবাইলের সিগন্যাল সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়। এতে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।
ঘরেই এই তত্ত্ব পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। একটি ধাতব বক্সের মধ্যে স্মার্টফোন রেখে কল করার চেষ্টা করলে দেখা যাবে ফোনে রিং বাজছে। কারণ, বক্সে কিছু ফাঁকা স্থান থাকে যা তরঙ্গকে প্রবেশ করতে দেয়। কিন্তু এরপর সম্পূর্ণ ফোনটি টিন ফয়েল বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে অত্যন্ত যত্নসহকারে সিল বা পেঁচিয়ে দেওয়ার পর আবার কল করা হলে তখন কোনো রিং বাজবে না। এর কারণ হলো ফয়েলটি একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যারাডে কেজ তৈরি করায় তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। ঠিক একই কারণে লিফটের ভেতরে প্রবেশ করলেই ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যায় এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সূত্র: বিবিসি আর্থ সায়েন্স




