যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক জয় লাভ করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নগর পরিকল্পনাবিদ নিত্যা রামন। এই জয়ের পর আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি জানান, লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটি তাকে এবং তার পরিবারকে অনেক কিছু দিয়েছে এবং একজন অভিবাসীকে পরবর্তী মেয়র হিসেবে বেছে নেওয়া তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তার এই জয়ের ফলে নিউইয়র্ক, লন্ডন এবং লস অ্যাঞ্জেলেস—বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি শহরের নেতৃত্ব এখন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের হাতে চলে গেল।

৪৫ বছর বয়সী নিত্যা রামন একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী। তার এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি গত অর্ধশতাব্দীর সবচেয়ে বড় জয় ছিনিয়ে নিয়েছে এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। নিত্যা রামনকে সমর্থন দেওয়া 'ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা' (ডিএসএ) এই নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে, তাদের সমর্থিত ১০৫ জন প্রার্থী জয়লাভের পথে বলে দাবি করা হয়েছে।

ভারতের কেরালা রাজ্যে জন্ম নেওয়া নিত্যা রামন মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার পর তিনি ভারতে ফিরে চেন্নাই শহরের নগর ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কাজ করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে আসেন এবং গৃহহীনদের সহায়তার জন্য 'সেলাহ নেবারহুড হোমলেস কোয়ালিশন' নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এছাড়া তিনি নারীদের আইনি সহায়তাকারী সংস্থা 'টাইমস আপ'-এর বিনোদন বিভাগের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাজনৈতিক জীবনে তার যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালে, যখন তিনি সিটি কাউন্সিলের সদস্য ডেভিড রিউকে পরাজিত করে ডিএসএ-র সমর্থিত প্রথম প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। এবারের মেয়র নির্বাচনেও তিনি চমক তৈরি করেছেন। প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতা গ্যাভিন নিউসম, কমলা হ্যারিস এবং ন্যান্সি পেলোসি বর্তমান মেয়র ক্যারেন বাসের পক্ষে প্রচার চালালেও শেষ পর্যন্ত নিত্যা রামন জয়ী হন। তিনি শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়ে এবং সাবেক মিত্র ক্যারেন বাসের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে এই লড়াইয়ে নামেন, কারণ তার মতে শহরটি একটি 'চরম সংকটের' মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

নবনির্বাচিত মেয়রের প্রধান লক্ষ্য হলো লস অ্যাঞ্জেলেসের দীর্ঘদিনের গৃহহীন সংকট নিরসন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা। ২০২৫ সালের তথ্যমতে, শহরে প্রায় ৪৪ হাজার গৃহহীন মানুষ রয়েছেন। নিত্যা রামনের লক্ষ্য ২০২৮ সালের অলিম্পিক গেমসের আগেই এই সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এজন্য তিনি নতুন আবাসন তৈরি এবং চিকিৎসক দলের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন। এছাড়া তিনি পুলিশ প্রধান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কারণ ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার (আইসিই) অভিযান ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ প্রধান জনআস্থা হারিয়েছেন বলে তার অভিযোগ।

আন্তর্জাতিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং কূটনৈতিক চাপ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানোর কথা বলেছেন। যদিও ইসরায়েলবিরোধী 'বিডিএস' আন্দোলনকে প্রচারণায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ডিএসএ-র সাথে তার কিছুটা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তারা তার সমর্থন বজায় রাখে।