বাংলাদেশে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড আয়ের করকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী, লভ্যাংশ আয়ের ওপর করের হার এখন সরাসরি ১৫ শতাংশ। আগে লভ্যাংশ আয়কে সাধারণ আয়ের সাথে যুক্ত করে কর গণনা করা হতো, যার ফলে উচ্চ আয়ের করদাতাদের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এবং সারচার্জসহ ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হতো। নতুন নিয়মে উৎসে কেটে রাখা এই কর আর 'ন্যূনতম কর' হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি 'অগ্রিম আয়কর' হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, উদ্যোক্তা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা। আগে উচ্চ ব্যক্তিগত করহারের কারণে পরিচালকেরা লভ্যাংশের চেয়ে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিতে বেশি আগ্রহী ছিলেন, কারণ সেগুলো কোম্পানির খরচ হিসেবে দেখানো যেত। এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে করের হার ৩০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশ হওয়ায় তারা কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ নিতে উৎসাহিত হবেন। এর ফলে কোম্পানিগুলোর ব্যালেন্স শিটে কৃত্রিম খরচ দেখানোর প্রবণতা কমবে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করপোরেট করের পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণিতেও নির্দিষ্ট কর পাবে।
তবে এই নতুন সমীকরণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগে লভ্যাংশের ওপর উৎসে কর ছিল ১০ শতাংশ, যা এখন বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা ছোট বিনিয়োগকারী যাদের মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তাদের লভ্যাংশ থেকে শুরুতেই ১৫ শতাংশ কর কাটা হবে। উদাহরণস্বরূপ, ৩ লাখ টাকা লভ্যাংশ আয়ের ক্ষেত্রে এখন ৪৫ হাজার টাকা কর কাটা হবে, যা আগে কম ছিল।
প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ভারতে লভ্যাংশ আয় সাধারণ আয়ের সাথে যুক্ত হয়ে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের বেশি কর হতে পারে, যার তুলনায় বাংলাদেশের নতুন ১৫ শতাংশ করহারটি প্রতিযোগিতামূলক। তবে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় এটি এখনো বেশি। ভিয়েতনামে এই কর মাত্র ৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ১০ শতাংশ (পুনর্বিনিয়োগ করলে শূন্য শতাংশ) এবং মালয়েশিয়ায় নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিগত কর নেই।
পুঁজিবাজারের জন্য এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। লভ্যাংশের ওপর নির্দিষ্ট করহারের নিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল গেইনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী লভ্যাংশের দিকে বেশি আগ্রহী করবে, যা মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ বাড়াবে এবং বাজারের অস্থিরতা কমাবে। তবে এই ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল পেতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ লভ্যাংশ করমুক্ত রাখা অথবা করের হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।




