কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন কেবল বস্তি এলাকার সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শহরের সচ্ছল ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তানরাও এই অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা ও তদন্তে দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের সন্তানরা এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, যা অনেক পরিবারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দেবীদ্বারের এক সরকারি কর্মকর্তার সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে নিরাময় কেন্দ্রে যাওয়ার ঘটনা এর প্রমাণ।
সম্প্রতি কুমিল্লায় বেশ কিছু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এই কিশোর গ্যাংগুলোর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীকে ছিনতাইয়ের পর চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে 'আরজেড-৩৬' গ্যাংয়ের সদস্যরা। তদন্তে জানা গেছে, অপ্রতিমকে টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। এই পাঁচ খুনের তালিকায় বুলেট ও অপ্রতিম ছাড়াও হৃদয়, বাঁধন এবং সজীব ওরফে বাবু রয়েছেন।
প্রথম আলোর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুমিল্লায় অন্তত ১২টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং বা উপদল রয়েছে। এর মধ্যে রতন বা আর স্কোয়াড, ঈগল, সিবিকে, সিবিকে ডেঞ্জার জোন, সিবিকে জুনিয়র, সিবিকে স্পেশাল, আরডিএক্স, আরজেড-৩৬, সিডিএক্স, কিং স্কোয়াড, রেড ৯৯৯ এবং বিজিএম উল্লেখযোগ্য। এই দলগুলো প্রায়ই প্রকাশ্য রাস্তায় অস্ত্রের মহড়া দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করে আতঙ্ক ছড়ায়। বিশেষ করে রতন গ্রুপ এবং ঈগল গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রায়ই সংঘর্ষ ও শক্তি প্রদর্শনের ঘটনায় দেখা যায়। এমনকি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনেই মহড়া দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ধরনের অপরাধে মোট ৮৮১ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন, বুলেট হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একজন আসামি আগে অন্য অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়েছিলেন।
পুলিশ ও এসআরবি-র দাবি, তারা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে গ্যাং সদস্যদের আটক করছে। তবে কিশোর অপরাধ দমনে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, বরং পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অবস্থান বা বন্ধুচক্র সম্পর্কে অবগত নন। কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) প্রতিনিধিরা মনে করেন, সঠিক পরিচর্যার অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার শিক্ষিত পরিবারের সন্তানদেরও অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পুলিশের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের জন্য আলাদা কোনো আইন না থাকায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী মামলা করা হচ্ছে, তবে জামিন পাওয়ার পর তাদের নজরদারি বজায় রাখা একটি কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।




