বর্তমান যুগের আধুনিক ক্রিকেটে কোচিং স্টাফের পাশাপাশি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট। আগে এই কাজটিকে কেবল 'ভিডিও অ্যানালাইসিস' বলা হলেও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এখন এটি 'পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট'-এ রূপান্তরিত হয়েছে। একজন অ্যানালিস্টের মূল কাজ হলো ল্যাপটপে বিশেষ সফটওয়্যার, ভিডিও এবং বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণ করে দলের জন্য সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করা।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের বর্তমান পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট শাওন জাহান জানান, প্রতিপক্ষ দলের ক্রিকেটারদের পুরনো ভিডিও বিশ্লেষণ করে তাদের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করাই এই কাজের প্রধান লক্ষ্য। opposing দলের ব্যাটিং-বোলিং শৈলী, কতজন বাঁহাতি বা ডানহাতি খেলবেন, স্পিনার বা পেস বোলারদের মোকাবিলায় কী কৌশল নেওয়া উচিত—এই সব বিষয়েই তিনি দলকে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন। এছাড়া ম্যাচের ভেন্যুর আবহাওয়া, পিচের আচরণ এবং বাতাসের প্রভাব বিশ্লেষণ করে রান করার সহজ পথ বা বোলিং কৌশলের পরামর্শ দেন তিনি। শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজস্ব দলের খেলোয়াড়দের সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান দিতেও তিনি সহায়তা করেন। তবে শাওন স্পষ্ট করেন যে, অ্যানালিস্ট কেবল পরামর্শ দেন; মাঠের লড়াইয়ে তার বাস্তবায়ন করেন ক্রিকেটাররা এবং পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন কোচ।
একজন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্টের দৈনন্দিন কাজ অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। প্রতিটি বলের সুইং, পিচ করার স্থান এবং ব্যাটসম্যানের শটের দিকসহ প্রায় ১০০টি তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়। দুটি বলের মাঝখানের সামান্য বিরতির মধ্যেই এই ডেটা সফটওয়্যারে আপলোড করতে হয়। শাওন জাহানের কাছে বর্তমানে প্রায় এক কোটি বলের বিশাল ডেটাবেস রয়েছে, যা তাকে যেকোনো ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে সঠিক পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করে।
শাওন জাহানের এই পেশায় যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে, যখন তিনি ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলতেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রথম অ্যানালিস্ট নাসির আহমেদ নাসুর মাধ্যমে তিনি এই সুযোগ পান। এমবিএ ডিগ্রি এবং ক্রিকেটের অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ তাকে এই পেশায় স্থিতিশীলতা দেয়। নারী দলের সঙ্গে ১০ বছর কাজ করার পর তিনি ছেলেদের জাতীয় দলে যোগ দেন। ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে তাঁর তথ্যানুসারী পরিকল্পনার বড় ভূমিকা ছিল। তিনি জানান, আবহাওয়ার বিশ্লেষণ এবং সঠিক ডেটার ভিত্তিতেই তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে বাংলাদেশ জিতবে।
যারা এই পেশায় আসতে আগ্রহী, তাদের জন্য শাওন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা নেই, তবে কিছু অনলাইন কোর্স প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো খেলাটির প্রতি গভীর অনুরাগ, খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি নজর এবং প্রচুর পড়াশোনা। যেহেতু প্রচুর সফটওয়্যার চালাতে হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হয়, তাই এই পেশার জন্য প্রয়োজন প্রচণ্ড ধৈর্য। অনেক সময় দিনে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক।




