ফুটবলের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সম্মান 'ব্যালন ডি’অর' জয়ের ক্ষেত্রে গোলকিপারদের লড়াই সব সময়ই প্রতিকূল। ১৯৬৩ সালে সোভিয়েত কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিন এই পুরস্কার জেতার পর দীর্ঘ ৬৩ বছরে আর কোনো গোলরক্ষক এই গৌরব অর্জন করতে পারেননি। এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর মনোনীত ৩০ জনের তালিকায় কোনো গোলকিপারের নাম নেই, যার ফলে ২৬ অক্টোবর লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে কোনো গোলরক্ষককে এই পুরস্কার জয়ের সুযোগ থাকছে না।

ইতিহাস പരിശോധ করলে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন গোলকিপার এই পুরস্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ২০০২ বিশ্বকাপে অলিভার কান গোল্ডেন বল জিতেছিলেন এবং ব্যালন ডি’অরে তৃতীয় হয়েছিলেন। যদিও ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি ভুলের কারণে তিনি সমালোচিত হন, তবে তার সেই সামগ্রিক পারফরম্যান্স গোলকিপারদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছিল। এছাড়া ১৯৭৩ সালে দিনো জফ, ২০০৬ সালে জিয়ানলুইজি বুফন এবং ২০১৪ সালে ম্যানুয়েল নয়্যার ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। নয়্যার গোল ঠেকানোর পাশাপাশি সুইপার-কিপার হিসেবে বল ডিস্ট্রিবিউশনে নতুন মাত্রা যোগ করলেও পুরস্কারটি অধরা থেকে গেছে।

গোলকিপারদের এই পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হলো ফুটবলে পারফরম্যান্স পরিমাপের প্রচলিত পদ্ধতি। সাধারণত গোল এবং অ্যাসিস্টের সংখ্যার মাধ্যমে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবদান সহজে দৃশ্যমান হয়, যা গ্যালারিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। অন্যদিকে, একজন গোলকিপারের কাজ মূলত প্রতিরোধমূলক। একটি অবিশ্বাস্য সেভ হয়তো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, কিন্তু গোল করার উন্মাদনার কাছে তা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এছাড়া 'এক্সপেক্টেড গোল' (xG) মডেলের মতো আধুনিক পরিসংখ্যান পদ্ধতিগুলোও একজন গোলকিপারের সামগ্রিক প্রভাব, যেমন—সঠিক পজিশনিং, রক্ষণভাগের সঙ্গে যোগাযোগ বা বিপদের পূর্বাভাস পেয়ে আগেভাগে বল সরিয়ে দেওয়া—পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারে না।

মানসিক প্রভাবের দিক থেকেও গোলকিপারদের গুরুত্ব অপরিসীম। নটিংহাম ফরেস্টের কোচ ব্রায়ান ক্লফ একবার দাবি করেছিলেন, একজন দক্ষ গোলকিপার পুরো মৌসুমে দলকে ১৫ থেকে ২০ পয়েন্ট এনে দিতে পারেন। কারণ গোলকিপারের আত্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই ডিফেন্ডাররা আরও আগ্রাসী হয়ে খেলতে পারেন। তবে সমস্যা হলো, এই পরোক্ষ অবদানগুলো ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় খুব কমই স্থান পায়।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো গোলকিপারদের কাজের প্রকৃতি। একজন ফরোয়ার্ড পুরো ম্যাচ নিষ্ক্রিয় থেকে শেষ মুহূর্তে একটি গোল করে নায়ক হতে পারেন। কিন্তু একজন গোলরক্ষক ৮৯ মিনিট নিখুঁত খেলা দেখিয়েও শেষ মুহূর্তে একটি সামান্য ভুলের কারণে পুরো ম্যাচের গৌরব হারাতে পারেন। ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালে অলিভার কানের অভিজ্ঞতা ছিল ঠিক তেমন।

এই বৈষম্য দূর করতে ২০১৯ সাল থেকে গোলকিপারদের জন্য আলাদা 'ইয়াশিন ট্রফি' চালু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল ক্লিন শিটের হিসাব না করে গোলকিপারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রক্ষণভাগের ওপর তাদের প্রভাবের মূল্যায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত গোল এবং অ্যাসিস্টের সমান্তরালে গোলকিপারদের প্রতিরোধক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না, ততক্ষণ তারা ব্যালন ডি’অরে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবেন না।