ক্যানসার রোগীদের জন্য পরিকল্পিত শারীরিক ব্যায়ামের ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে একের পর এক গবেষণালব্ধ প্রমাণ সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সঠিক ব্যায়াম কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব এবং ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। তবে এই প্রয়োজনীয় সেবার সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের বাসিন্দা ৬৬ বছর বয়সী লি কোলকার এর একটি বাস্তব উদাহরণ। মেটাস্ট্যাটিক কিডনি ক্যানসারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার পর তিনি তীব্র ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যায় ভুগতেন। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিক্যাল সেন্টারের পরামর্শে তিনি বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক অলিভিয়া মাস্টেনের তত্ত্বাবধানে অনলাইনে ব্যায়াম শুরু করেন, যা তাঁর কর্মশক্তি পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম ক্যানসার রোগীদের জীবনকাল বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে এর সুফল বেশি। সম্প্রতি একটি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়ালে কোলন ক্যানসারের রোগীদের ওপর তিন বছর ধরে পরিকল্পিত ব্যায়ামের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলাফল ছিল আশাব্যঞ্জক; এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া রোগীদের ৯০ শতাংশ আট বছর পরও বেঁচে ছিলেন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ দলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৮৩ শতাংশ। এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা খরচও কমেছে। এই পুরো কর্মসূচিতে একজন রোগীর খরচ হয় প্রায় ৩ হাজার ডলার।
কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও অনকোলজিস্ট ডা. ক্রিস্টোফার বুথ জানান, ব্যায়ামের এই উপকারিতা যদি কোনো ওষুধের মাধ্যমে পাওয়া যেত, তবে তা দ্রুতই নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হতো এবং বিমা কোম্পানিগুলো এর খরচ বহন করত। বর্তমানে কোলন ক্যানসার রোগীদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়, কিন্তু বিমায় এর খরচ অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বড় পরিসরে এই সেবা চালু করা কঠিন হচ্ছে। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ফ্রেড হাচ ক্যানসার সেন্টারের স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ডা. স্কট র্যামসে এই সাফল্যকে অভাবনীয় বলে অভিহিত করেছেন, কারণ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের মতো দামি ওষুধগুলো (যেমন ডারাক্সোনরাসিব, যার বার্ষিক খরচ ৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার) আয়ু সামান্য বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে বেঁচে থাকার হার বাড়াতে পারে না।
বর্তমানে এই ধরনের সেবা মূলত বড় ক্যানসার সেন্টারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা অনেক সময় দাতাদের অনুদান বা রোগীর নিজস্ব অর্থায়নে চলে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা এই সুযোগ পান না। তবে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন, বোস্টনের ডানা-ফারবার ক্যানসার ইনস্টিটিউট রোগীদের বিকল্প চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠিয়ে প্রশিক্ষকের পরামর্শ ও অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করে। আবার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকো রোগীদের ফিজিক্যাল থেরাপি ও পুনর্বাসন সেবায় পাঠায়, যা বিমার আওতায় থাকে। ওয়াইএমসিএ-র কিছু শাখায় ১২ সপ্তাহের স্বল্পমূল্যের বা বিনামূল্যে কর্মসূচি চালু আছে।
ইউপিএমসি হিলম্যান ক্যানসার সেন্টারের গবেষক ও 'মুভিং থ্রু ক্যানসার' কর্মসূচির পরিচালক ক্যাথরিন শমিৎজ মনে করেন, ব্যায়াম কেবল শারীরিক নয়, বরং আচরণের পরিবর্তন। তিনি জানান, প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন পরিকল্পনা করা হয়। ৬৮ বছর বয়সী কিম্বারলি বার্কার মূত্রাশয় ও জরায়ুর ক্যানসারের পর তীব্র ক্লান্তি ও ব্যথায় ভুগতেন। কিন্তু ১২ সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পর তিনি পুনরায় তাঁর প্রিয় সাইকেল চালানো শুরু করতে পেরেছেন।
এই ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে ইউপিএমসি একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী বছর থেকে তারা তাদের স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনার আওতায় স্তন ক্যানসারের রোগীদের জন্য এই ব্যায়াম সুবিধার খরচ বহন করবে। ডা. শমিৎজের মতে, এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে এক্সারসাইজ অনকোলজি বিমার আওতায় আসবে। গবেষণা দেখিয়েছে, নিয়মিত ব্যায়াম করলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং জরুরি বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে, যা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস করে। এই পরীক্ষা সফল হলে ২০২৮ সালের মধ্যে সব ধরণের ক্যানসার রোগীর জন্য এই কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।




