দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে একগুচ্ছ কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে এই পরিকল্পনাগুলো উপস্থাপন করা হয়। সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বের এই সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা (৩২.৭৮ শতাংশ) এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা (৩১.৪১ শতাংশ)। উদ্বেগের বিষয় হলো, গত মার্চ মাসের তুলনায় মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর পর্যালোচনা সভা করা হবে। ঋণ আদায়ের পথে প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অগ্রগতির তদারকি করবে। এছাড়া প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ ২০টি খেলাপি ঋণের আদায় পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে 'এনপিএল রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি' নির্দেশিকা তৈরি এবং বর্তমান ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আইএফআরএস-৯ (IFRS-9) অনুযায়ী ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ বা সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির ভিত্তিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় ঋণ মন্দ হওয়ার পর প্রভিশন রাখা হয়, তবে নতুন নিয়মে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য ক্ষতিকেও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে বড় অংকের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপর চাপ কমাতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হলে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের তাগিদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, ঋণগ্রহীতারা যাতে রিট আবেদন করে আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত বা স্থবির করতে না পারে, সেজন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়নের কাজ চলছে, যার মাধ্যমে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কিনে নিয়ে আদায়ের কাজ করবে। অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের মাধ্যমে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত অর্থঋণ আদালতের প্রায় ৭৪ হাজার ৬৭৯টি জমে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।