চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিলেও বর্তমানে সেই প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক উভয়ের তথ্যানুসারে, সরকারের ব্যাংক ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবণতার মূল কারণ হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্পের মন্থর গতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট এই দুই মাসে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে মোট ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে। তবে একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগের নেওয়া ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর ফলে দুই মাসের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকায়। বিস্তারিতভাবে দেখলে দেখা যায়, জুলাই মাসে নিট ঋণ ছিল ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা, যা আগস্টে কমে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ, অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায় দ্বিতীয় মাসে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। উল্লেখ্য যে, অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকার ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছিল, যার মধ্যে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এবং ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া।
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৮ শতাংশের বেশি থাকলেও তা নিম্নমুখী হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেলে ভাতা দ্বিগুণ হওয়ার ফলে বাজারে পুনরায় inflationary pressure বা মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতেই সরকার এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বরং ঋণ পরিশোধের দিকে নজর দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব কম আদায়ের কারণে ঋণ নেওয়াটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব, তবে এর পরিশোধের পরিকল্পনা সরকারের নিজস্ব।
উন্নয়ন খাতের কথা বললে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১.৮৫ শতাংশ। মোট ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই মাসের হিসেবে সর্বনিম্ন ব্যয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যার ১১.৪৯ শতাংশ প্রথম দুই মাসেই নেওয়া হয়ে গেছে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা হলেও শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশ না করায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ পরিশোধ করা ইতিবাচক হলেও বেতন বৃদ্ধি ও জ্বালানি মূল্যের প্রভাবে সামনের দিনগুলোতে সরকারি ব্যয় ও ঋণের পরিমাণ পুনরায় বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান সতর্ক করেছেন যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রভাবের কারণে মুদ্রানীতি এখনই শিথিল করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ মূল্যস্ফীতি এখনও স্থিতিশীল পর্যায়ে ফেরেনি।




