খাগড়াছড়ির রিছাং ঝরনার আশপাশে পাহাড়ের চূড়াগুলোতে এখন পাকা ধানের সমারোহ। চৈত্র ও বৈশাখ মাস থেকে কঠোর পরিশ্রম করে জুম চাষিরা ফসল ফলিয়েছেন। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত চাষিরা। ৫৫ বছর বয়সী জুম চাষি হেমেন্দ্র ত্রিপুরার মতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ফলন ভালো হলেও পাহাড়ের দুর্গম পথে ফসল আনা-নেওয়ার কষ্ট এবং বাজারে কম দাম পাওয়া তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, পরিবারের চালের চাহিদা মেটাতে ধান রাখা হয় এবং বাকি ফসল যেমন—আদা, হলুদ, মিষ্টি কুমড়া, তিল ও বেগুন বিক্রি করে সংসার চালানো হয়।
খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলায় প্রচলিত এই স্থানান্তরিত চাষাবাদ পদ্ধতিতে পাহাড়ের ঢালে প্রায় ৪০ ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জুম চাষের আয়তন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে জুমের আবাদ ক্রমশ কমেছে। ২০২১-২২ সালে যেখানে ১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছিল, ২০২৫-২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সেগুন ও গামার মতো বাণিজ্যিক বাগানের বিস্তার এবং সংক্ষিপ্ত জুমচক্রের কারণে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। দীঘিনালার স্থানীয় কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা এবং চাষি সুধাং ত্রিপুরা জানান, আগে যেখানে জুমের আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে বাগানবাড়ির ভিড়।
চাষিদের অভিযোগ, তারা সরকারের কাছ থেকে যথাযথ কৃষি ঋণ, সার বা কীটনাশক সহায়তা পান না। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এ বছর ১৫০০ চাষির মাঝে বীজ ও সার বিতরণের কথা জানিয়েছে, তবে সামগ্রিক সহায়তা এখনো অপ্রতুল বলে মনে করেন সাবেক ইউপি সদস্য গণেশ ত্রিপুরা।
অন্যদিকে, জুম চাষকে টেকসই করতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন জাতের ধানের গবেষণায় সাফল্য পেয়েছে। খাগড়াছড়ির খমলা ত্রিপুরা ও রন্টু চাকমার জমিতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় 'কোম্পানি ধান' বা 'বিন্নি ধানের' তুলনায় ব্রি-৮৩ জাতের ফলন অনেক বেশি। ব্রি-৮৩ এর গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৩.২৪ থেকে ৩.৫৭ টন, যেখানে স্থানীয় জাতগুলোর ফলন ১.৫৩ থেকে ২.৪৭ টনের মধ্যে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মীর ওবায়দুর রহমান জানান, পোকার আক্রমণ কম এবং ফলন বেশি হওয়ায় এই জাতটি জুম চাষিদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। এছাড়া বায়োটেকনোলজি বিভাগের মাধ্যমে ভিটামিন ‘ই’ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ চলছে, যার ফলন হেক্টরে ৫ থেকে ৬ টনের বেশি হতে পারে।
জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা মনে করেন, জুম কেবল কৃষি নয়, বরং পাহাড়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। ভূমির সংকোচন এবং তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহে এই পদ্ধতি সংকটে পড়েছে। তার মতে, জুম চাষিদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং সঠিক বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব হবে।




