মহাশূন্যের সবচেয়ে রহস্যময় এবং সর্বগ্রাসী বস্তু ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর কোনো তারা গ্রাস করার পর কীভাবে এবং কখন বিশাল দূরত্বে বস্তুর স্রোত বা 'জেট' নিক্ষেপ করে, সেই জটিল ধাঁধার সমাধান করেছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘকাল ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এটি একটি রহস্য ছিল যে, তারা ধ্বংস হওয়ার ঠিক কতদিন পর এই ঘটনাটি ঘটে। কোনো ক্ষেত্রে এটি এক বছর পর আবার কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ বছর পর দেখা যেত। তবে সম্প্রতি 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই রহস্যের জট খুলেছে।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার 'কার্টিন ইউনিভার্সিটি'র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. অ্যাডেল গুডউইন এবং 'ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি'র ড. অ্যান্ড্রু মামেরি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের মাধ্যমে তারা গ্রাসের ২০টি 'টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট' পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের ভরের চেয়ে লাখ লাখ বা কোটি গুণ বড় এই ব্ল্যাক হোলগুলো তাদের খাবার গ্রহণের প্রক্রিয়ায় দুটি নির্দিষ্ট ধাপে শক্তিশালী জেট বা প্রবাহ তৈরি করে। প্রথম ধাপটি ঘটে যখন ব্ল্যাক হোল অত্যন্ত দ্রুত গতিতে উপাদান গ্রহণ করে। দ্বিতীয় ধাপটি আসে তারা ছিন্নভিন্ন হওয়ার শত শত বা হাজার হাজার দিন পর, যখন খাবার গ্রহণের হার সর্বোচ্চ সীমার মাত্র ২ শতাংশে নেমে আসে। বিজ্ঞানীরা রূপক অর্থে এই বস্তু নিক্ষেপের প্রক্রিয়াটিকে ব্ল্যাক হোলের 'ঢেকুর তোলা' বলে অভিহিত করেছেন।
ব্ল্যাক হোলের গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর ঘনত্ব এতই বেশি যে একটি নির্দিষ্ট সীমার পর এর মহাকর্ষ বল সবকিছুকে আটকে ফেলে। এই সীমানাকে বলা হয় 'ইভেন্ট হরাইজন' বা ঘটনা দিগন্ত। এখান থেকে মুক্তি পেতে হলে আলোর গতির চেয়েও দ্রুত ভ্রমণ করতে হয়। যখন কোনো তারা এই সীমানার খুব কাছাকাছি আসে, তখন তীব্র মাধ্যাকর্ষণ টানে সেটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা 'স্প্যাগেটিফিকেশন' বলে বর্ণনা করেন। এই প্রক্রিয়ায় তারার প্রায় অর্ধেক অংশ ব্ল্যাক হোল গিলে ফেলে, আর বাকি অংশ প্রচণ্ড শক্তিতে মহাশূন্যে পুনরায় নিক্ষিপ্ত হয়। এই জেটগুলো কখনো কখনো এত বিশাল হয় যে পুরো ছায়াপথের বিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সূর্যের ভরের ১০ থেকে ৫০ গুণ ছোট তারা-ভরের ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রেও একই ধরণের জেট নির্গমন দেখা যায়। নতুন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ব্ল্যাক হোলের আকার যাই হোক না কেন, তারা তাদের খাবার গ্রহণের চক্রের ঠিক একই বিন্দুতে এই স্রোতগুলো নির্গত করে। ড. গুডউইনের মতে, এই আবিষ্কারের ফলে এখন থেকে বিজ্ঞানীরা নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দিতে পারবেন যে কখন এই জেটগুলো নিক্ষিপ্ত হবে। এতে টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ সময় বাঁচবে এবং জেটগুলোর শক্তি ও ব্ল্যাক হোলের বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও 'সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি'র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. সারা ওয়েব জানান, সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলোর বিবর্তনের দুটি ভিন্ন সময়ে তাদের আচরণ এখন অনেক বেশি অনুমানযোগ্য।




