বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা হটডগ—কেচাপ ছাড়া এগুলোর স্বাদ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত সসগুলোর একটি এটি। তবে আজকের যে লাল টমেটো কেচাপ আমরা চিনি, তার শুরু কিন্তু টমেটো দিয়ে নয়। এর জন্মস্থান সুদূর চীন, সময়টা প্রায় দুই হাজার বছর আগে, যখন এটি ছিল মাছের গাঁজন করা এক ধরনের নোনতা সস।
খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৩০০ অব্দে দক্ষিণ চীনের মিনভাষী জনগোষ্ঠী মাছের নাড়িভুঁড়ি, মাংসের ছোট অংশ এবং সয়াবিন একসঙ্গে গাঁজন করে একটি সস প্রস্তুত করত, যার নাম ছিল 'কে-চাপ'। দীর্ঘদিন অবিকৃত থাকায় সমুদ্রযাত্রায় নাবিকদের কাছে এটি অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে এই সস ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে পৌঁছে যায়।
১৭০০-এর দশকের শুরুর দিকে সে অঞ্চলে পৌঁছে ব্রিটিশ বণিকেরা এর স্বাদে মুগ্ধ হন এবং স্বদেশে ফেরার সময় রেসিপিও সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু ইংল্যান্ডে এসে মূল রেসিপিটি আর আগের মতো থাকে নি—মাছের বদলে ব্যবহার শুরু হয় নানা নতুন উপাদান।
১৮ শতকে কেচাপের অসংখ্য রূপ দেখা গেছে। ঝিনুক, সামুদ্রিক শামুক, মাশরুম, আখরোট, সেলারি, লেবু, পিচ এমনকি এলডারবেরি ফল দিয়েও তৈরি হতো এই সস। উপাদানগুলো লবণের সঙ্গে গাঁজন করে অথবা দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হতো, ফলে তৈরি হতো টেকসই ও ঝাঁঝালো এক সস। সে সময়ের বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক জেন অস্টিন মাশরুম কেচাপের অনুরাগী ছিলেন বলে জানা যায়।
এখনও অবশ্য টমেটো কেচাপের অস্তিত্ব ছিল না। বহু বছর ইউরোপের মানুষ টমেটোকে ভয় পেত, ধারণা করত এটি বিষাক্ত। পরে বোঝা যায়, টমেটো নয়; বরং সিসার প্রলেপ দেওয়া ধাতব পাত্রে টমেটো খাওয়ার কারণেই মানুষ অসুস্থ হতো। এই ভুল ধারণার কারণে টমেটো দীর্ঘদিন রান্নাঘরে জায়গা পায় নি।
১৮১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জেমস মিজ প্রথম টমেটো দিয়ে কেচাপ তৈরির রেসিপি প্রকাশ করেন। তখন টমেটো 'লাভ অ্যাপল' নামে পরিচিত ছিল। তবে সেই কেচাপ বেশি দিন সংরক্ষণ করা যেত না, কারণ টমেটো দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত।
কয়েক দশক পর এই সমস্যার সমাধান আসে। ১৮৭৬ সালে হেইঞ্জ কোম্পানি টমেটো, ভিনেগার, ব্রাউন সুগার, লবণ ও নানা মসলার সংমিশ্রণে নতুন ধরনের কেচাপ বাজারে আনে। ভিনেগার ব্যবহারের কারণে এটি দীর্ঘদিন ভালো থাকত। হেইঞ্জই প্রথম স্বচ্ছ কাচের বোতলে কেচাপ বিক্রি শুরু করে, ফলে ক্রেতারা বোতলের ভেতরের পণ্য নিজ চোখে দেখতে পেতেন। অল্প সময়েই এই কেচাপ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে টমেটো কেচাপই সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়। প্রতিবছর কোটি কোটি বোতল কেচাপ বিক্রি হয়। তবে অনেকেই জানেন না, তাঁদের প্রিয় এই সসের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাছের গাঁজানো এক সস হিসেবে। শত শত বছর ধরে নানা দেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের হাত ঘুরে কেচাপ ক্রমাগত বদলেছে—আর সেই দীর্ঘ বিবর্তনের ফলেই আজ আমরা পেয়েছি পরিচিত লাল টুকটুকে টমেটো কেচাপ।




