চীনের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে শতবর্ষী ডিমের অবস্থান বিশেষ। নাম শুনে অনেকেরই ধারণা হয়, এটি হয়তো এক শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত কোনো ডিম। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন — এই নামটি আসলে একটি সংরক্ষণ কৌশলের পরিচায়ক, কোনো পুরোনো ডিমের বয়স নয়। দেখতে সম্পূর্ণ কালো এই ডিমের সাদা অংশ জেলির মতো, আর কুসুম নরম ক্রিমের অনুভূতি দেয়। চীনা ভাষায় একে ‘পিদান’ বলা হয়, ইংরেজিতে ‘সেঞ্চুরি এগ’ নামে পরিচিত।

এই খাবারের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। চীনের হুনান প্রদেশে মিং রাজবংশের শাসনামলে, প্রায় ৬০০ বছর আগে এই সংরক্ষণ পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিল বলে প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। মূলত মাটি ও কাঠের ছাইয়ের প্রলেপে ডিমগুলো কালো বর্ণ ধারণ করে, যা পরবর্তীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে প্রশ্ন হলো, কীভাবে একটি সাধারণ ডিম এত গাঢ় রঙ নেয়? প্রক্রিয়াটি আসলে বেশ জটিল নয়। হাঁস, মুরগি কিংবা কোয়েলের ডিমের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় ছাই, লবণ, কুইক লাইম বা ক্যালসিয়াম অক্সাইড এবং ধানের খোসা। এসব উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় একটি মিশ্রণ, যা দিয়ে ডিমগুলোকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেওয়া হয়।

কাদার এই প্রলেপ ধীরে ধীরে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে ভূত্বকের মতো জমাট বাঁধে এবং ডিমের ভেতরে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে ডিমগুলো কালো রং পায় এবং খাওয়ার উপযোগী হয়। আরেকটি পদ্ধতিতে ফুটন্ত পানিতে ৩ পাউন্ড চা, ক্যালসিয়াম অক্সাইড, ৯ পাউন্ড সৈন্ধব লবণ এবং পোড়া ওক গাছের ৭ পাউন্ড ছাই মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা হয়। সেই পেস্ট ডিমের গায়ে প্রলেপ দেওয়ার পর ধানের খোসা দিয়ে ভরা ঝুড়িতে রেখে দেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো রূপান্তরিত হয় শতবর্ষী ডিমে। তবে প্রলেপ দেওয়ার সময় গ্লাভস ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি বলে জানানো হয়।

খাওয়ার সময় ডিমের খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে নেওয়া হয়। মূলত সাইড ডিশ হিসেবে এই ডিম পরিবেশন করা হয়, পাশাপাশি বিভিন্ন পদে ব্যবহারও দেখা যায়। অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে — শিশু বা ঘোড়ার মূত্রে ডিম ভিজিয়ে রাখা হয় শতবর্ষী ডিম তৈরির জন্য। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। শতবর্ষী ডিমের রহস্যময় চেহারা ও গন্ধের পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ নেই; বরং শতাব্দী প্রাচীন এই সংরক্ষণ কৌশল এবং ডিমের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়াই আসল কারণ। নামটি যতটা কৌতূহলোদ্দীপক, এর পেছনের গল্প ততটাই বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনির্ভর।