রাশিয়ার পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের বিশেষ উদ্যোগ 'আইসব্রেকার অব নলেজ' কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তর মেরুর রহস্যময় বরফ রাজ্যে ঘুরে আসার সুযোগ পেলেন রাজশাহীর দশম শ্রেণির ছাত্র মালেকুল সালেহীন প্রত্যয়। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের এই মেধাবী শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও ২১ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এই বিরল অভিযানে অংশ নেন। ১ আগস্ট ঢাকা থেকে মস্কো হয়ে তিনি পৌঁছান বন্দরনগরী মুরমানস্কে। সেখানে পৌঁছানোর পর তার প্রথম বিস্ময় ছিল 'পোলার ডে' বা মেরু দিবস, যেখানে সূর্য অস্ত যায় না এবং ২৪ ঘণ্টাই দিনের আলো থাকে।
৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় মূল যাত্রা। রাশিয়ার নৌবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় সামরিক নিয়ন্ত্রিত বন্দর এলাকা থেকে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশেষ জাহাজ 'আইসব্রেকারে' আরোহণ করেন প্রত্যয়। জাহাজে ওঠার পর প্রথম দিকে প্রচণ্ড ঝড় ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে তীব্র মোশন সিকনেস বা বমিভাবের সমস্যায় ভোগেন তিনি ও তার অনেক সহযাত্রী। ঢেউয়ের দুলুনিতে জাহাজ ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথম দুই দিন বেশ কঠিন সময় পার করতে হয় তাদের। তবে ধীরে ধীরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হন প্রত্যয়।
জাহাজ জীবনের প্রতিদিনের রুটিন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। সকালে শরীরচর্চার পর কনফারেন্স রুমে বিশেষজ্ঞ সেশনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ মেলে। মেরিন বায়োলজি, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন তারা। এছাড়া রাশিয়ার ক্রীড়া ও অলিম্পিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অভিজ্ঞতা শুনে অনুপ্রাণিত হন প্রত্যয়। জাহাজের ভেতরের পরিবেশ আরামদায়ক থাকলেও বাইরের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ভ্রমণের চতুর্থ দিনে প্রথমবার বরফ দেখার সুযোগ মেলে। সেই দিন পোলার বিয়ার বা মেরু ভালুকের দেখা পাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও ক্লান্তির কারণে ঘুমের ঘোরে সেই দৃশ্য মিস করেন প্রত্যয়, যা নিয়ে তার মনে আক্ষেপ ছিল। তবে ৭ আগস্ট বিকেলে একটি পুরু বরফের স্তরে অবতরণ করে উত্তর মেরুর কাছাকাছি পৌঁছান তিনি। সেই হিমশীতল বরফের ওপর দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে এক স্মরণীয় মুহূর্ত কাটান প্রত্যয়।
এই যাত্রায় ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও মিয়ানমারের সহপাঠীদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এছাড়া ফেরার পথে তার সাথে এক রুশ বিশেষজ্ঞের পরিচয় হয়, যিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত টি-শার্ট পরেছিলেন। তাঁর সাথে বাংলাদেশের আতিথেয়তা ও গ্রামের বিয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপচারিতা প্রত্যয়কে আবেগপ্রবণ করে তোলে। দীর্ঘ রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষে ১৩ আগস্ট তিনি পুনরায় মুরমানস্ক বন্দরে ফিরে আসেন।




