গুরুতর হৃদ্রোগে আক্রান্ত কোনো বন্দীর অবস্থার অবনতি ঘটলে কাশিমপুর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সংকটাপন্ন রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। অথচ গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর অভ্যন্তরেই অবস্থিত একটি ২০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন, যা নির্মাণের দুই দশক পরও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে পারেনি।
২০০৩ সালে ওই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০০৫ সালে শেষ হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক থেকে শুরু করে সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট, আবাসিক চিকিৎসক, চিকিৎসা কর্মকর্তা, সহকারী সার্জন, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও ডিপ্লোমা নার্সসহ বিভিন্ন পদ সৃষ্টি করা হলেও সেগুলোতে স্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে অন্তর্বিভাগ সম্পূর্ণরূপে অচল। বর্তমানে বহির্বিভাগে সেবা দিতে হচ্ছে প্রেষণে আসা চিকিৎসকদের মাধ্যমে।
জেলার সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান জানিয়েছেন, বিভিন্ন উপজেলা থেকে চারজন চিকিৎসা কর্মকর্তাকে কারা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সপ্তাহে একদিন করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেখানে রোগী দেখেন। কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক ও নার্সের অভাবে ২০০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
হাসপাতালের জন্য কেনা চিকিৎসা সরঞ্জামের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন বিভাগের জন্য ৮ কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার ৪০১ টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। কারাগার-২-এর জেল সুপার হালিমা খাতুন জানান, ২০১১ সাল থেকে এক্স-রে যন্ত্রসহ কিছু সরঞ্জাম এবং ২০১৩ সাল থেকে আলট্রাসাউন্ড মেশিন ও কম্পিউটারাইজড রেডিওগ্রাফি বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ৩ হাজার ৫০০, কারাগার-২-এ প্রায় ৫ হাজার ৪০০, কারাগার-১-এ প্রায় ২ হাজার এবং কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে প্রায় ৭০০ বন্দী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যক্ষ্মা, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে হৃদ্রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও কাশিমপুর থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে অনেক সময় প্রায় এক ঘণ্টা লাগে।
সেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বন্দীদের জন্য আলাদা প্রিজন সেল বা ওয়ার্ড নেই। হাসপাতালের পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন কারাগার থেকে রোগী আসেন। তাঁদের মধ্যে হৃদ্রোগীর সংখ্যা বেশি। মাসে ৩০ থেকে ৩৫ জন বন্দী রোগী সেখানে চিকিৎসা নেন। তিনি আরও জানান, বন্দীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড স্থাপনের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জনবল ঘাটতি কাটাতে কারা কর্তৃপক্ষ কিছু বিকল্প উদ্যোগ নিয়েছিল। হাইসিকিউরিটি কারাগারের জেল সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে জানান, কারারক্ষীদের মধ্যে এসএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করা কয়েকজনকে বাছাই করে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং পড়ানো হয়েছে। তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে রেডিওলজিস্ট, দুজনকে ফার্মাসিস্ট ও একজনকে ডিপ্লোমা নার্স হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। তবু চিকিৎসক সংকটের সমাধান হয়নি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের গাজীপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মন্তব্য করেন, আটক ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। ২০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের পরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান না থাকায় সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি বন্দীদের চিকিৎসার অধিকারও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।




