কানাডার বাণিজ্যিক স্থিতিস্থাপকতা ও মানসিক পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ওয়াশিংটনের জয় এখন অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে এমন মত উঠে এসেছে। প্রথমত, কানাডীয় জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ন্যানোস রিসার্চ গ্রুপের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে কানাডার নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া বা চীনের চেয়েও বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছেন। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান ডেটা বিজ্ঞানী নিক ন্যানোস জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আক্রমণের কারণেই কানাডীয় মতামত ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। তবুও, একটি বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে কানাডীয়দের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনের ব্লিটজ যেমন ব্রিটিশদের মনোবল দৃঢ় করেছিল, তেমনি ওয়াশিংটনের বারবার আক্রমণ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নের প্রতি সমর্থন একত্রিত করেছে। কার্নের জনপ্রিয়তা এখন প্রায় ৬০ শতাংশে, যেখানে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার নেমে এসেছে প্রায় ৩৫ শতাংশে। দাভোসে দেওয়া জোরালো ভাষণ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সপ্তাহান্তের মন্তব্য—প্রতিটি আঘাতকে কার্নে পরিণত করেছেন জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমেরিকা আমাদের ভেঙে দিতে চাইছে যাতে তারা আমাদের মালিক হতে পারে। কিন্তু তা কখনোই হবে না।”
অর্থনৈতিক দিক থেকেও কানাডা আরও শক্তিশালী অবস্থানে। অটোয়া বাণিজ্য বৈচিত্র্য আনছে, চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডির মতো কোম্পানিকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও কানাডার সুবিধা স্পষ্ট—৩০ বছরের জন্য ৪.২ শতাংশ হারে টাকা ধার নিতে পারছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের ফলন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৩ শতাংশে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে কানাডার তেল, অ্যালুমিনিয়াম ও সারের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষত পটাশের ক্ষেত্রে সাসকাচোয়ানকে ‘সৌদি আরব’ বলা হয়, যেখানে বৈশ্বিক সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি উৎপাদন হয়।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিকল্প সীমিত। ১৯৩০ সালের একটি বিতর্কিত আইনের ৩৩৮ ধারা ব্যবহার করে সম্প্রতি কানাডার বিস্তৃত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবে এটি কানাডার আমদানির মাত্র ৫ শতাংশকে প্রভাবিত করে। কারণ সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে রায় দিয়েছে যে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট শুল্ক আরোপ করতে পারবেন না। ওয়ালমার্ট এখন শুল্ক ফেরতের অর্থ ব্যবহার করে দাম কমাচ্ছে। এছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতিতে ক্লান্ত ভোক্তাদের খরচ কমানোর লক্ষ্যেই ট্রাম্প ৩ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত গরুর কিমা মাংসের আমদানিতে শুল্ক স্থগিত করেছেন। ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলেন, “এই পথ থেকে সরে আসার সময় এখনও আছে... ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিজয় উদযাপন না করায় শেষ মুহূর্তে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
এই বাণিজ্য যুদ্ধকে ‘মূর্খ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ফ্লোরিডার পর্যটন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত অটোমোবাইল নির্মাতারা—বেশিরভাগ মার্কিন কোম্পানি কানাডাকে সমৃদ্ধির অংশীদার হিসেবে দেখে। কানাডিয়ান আমেরিকান বিজনেস কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির সফল পুনর্গঠনের ফলে আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৩৭ হাজার এবং কানাডায় ৯৮ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। বিজনেস রাউন্ডটেবিলের প্রধান নির্বাহী জোশুয়া বোল্টেন এক বিবৃতিতে বলেন, “নতুন শুল্ক ও পাল্টা পদক্ষেপ মার্কিন ব্যবসা ও পরিবারের জন্য ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।”
অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক—দুই ক্ষেত্রেই বিরোধের সূত্রপাত। কুইবেকের ফরাসি ভাষা সংক্রান্ত আইনের বিরুদ্ধেও হামলা চালানো হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নেকে তার প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রশংসিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্প নিজের দলের সদস্যদের কাছ থেকেও সমালোচিত। এক সময় কানাডা ছিল আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিশ্বের দীর্ঘতম অরক্ষিত সীমান্ত অবৈধ অভিবাসন, মাদক পাচার বা নিরাপত্তা হুমকির জন্য কোনো সমস্যা নয়—বরং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এটি বিপরীত চিত্র তৈরি করে। ডেট্রয়েট ও উইন্ডসরকে সংযুক্তকারী গর্ডি হাও ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ সম্প্রতি খোলা হয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বিরোধের কারণে মার্কিন কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। একজন কানাডীয় প্রধান নির্বাহী সম্প্রতি বলেছিলেন, “একটি মূর্খ বাণিজ্য যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য সমাধান হয়, কিন্তু বিশ্বাস আর কখনোই ফিরে আসে না।” ফর্চুন ডটকমের জন্য ডায়ান ব্র্যাডি এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।




