দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি বেকারি শিল্প বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল এবং জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদন ক্ষমতা কমেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কাঁচামালের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক উদ্যোক্তা এখন মুনাফার বদলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
রাজধানীর মালিবাগ এলাকার 'কাকলি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট' কারখানার মালিক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, দৈনিক ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করলেও বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তিনি লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। সম্প্রতি একদিনেই তার ১৮ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। একইভাবে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, খিলগাঁও ও তেজগাঁওয়ের কারখানাগুলোতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ইলেকট্রিক ওভেনে থাকা পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকে জেনারেটর ব্যবহার করলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তা পর্যাপ্ত সহায়তা করছে না।
জ্বালানির সংকটের কথা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা জানান, নিয়মিত লাইনের গ্যাস না পাওয়ায় তারা ব্যয়বহুল এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকট কেবল ঢাকাতেই নয়, বরং নারায়ণগঞ্জ এবং দিনাজপুরের বেকারিগুলোতেও দৃশ্যমান। নারায়ণগঞ্জের 'সুইট নেশন বেকারি'র উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং দিনাজপুরের প্রায় ৭০ শতাংশ বৈদ্যুতিক ওভেনচালিত কারখানায় বিদ্যুৎ স্বল্পতার কারণে পণ্য নষ্ট হচ্ছে।
টিসিবি-র তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে খুচরা বাজারে খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, চিনির দাম ১১ শতাংশ এবং সয়াবিনের দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এক বছর আগে যে ময়দা বস্তাপ্রতি ২ হাজার ৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম ৩ হাজার ১০০ টাকা। চিনির দাম বস্তাপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সয়াবিন তেলের ড্রামপ্রতি দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্যমতে, সারাদেশে প্রায় ৭ হাজার ক্ষুদ্র বেকারি রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় ৭০০টির বেশি। এই খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন সতর্ক করে বলেছেন, গত ছয় মাসে কেবল ঢাকাতেই ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের মোট বেকারির প্রায় ১০ শতাংশ বা ৫০০ থেকে ৬০০টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়া এবং ব্যাংকঋণ না পাওয়ার ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।




