যন্ত্রাংশের আমদানির মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার এবং টয়োটার মতো চারটি অত্যন্ত দামি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর মাধ্যমে উদ্ঘাটিত এই ঘটনায় জানা গেছে, ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস নামের প্রতিষ্ঠানটি এই কারসাজি করেছে। আমদানি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া ছিল রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ৩/১ দীননাথ সেন রোডে। তবে তদন্তকারী দল সেখানে গিয়ে দেখেন, ওই ঠিকানায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। বরং সেখানে ২০১৮ সাল থেকে আল-আকসা বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১২ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক আবদুল কাইয়ুম জানান, এখানে আগে ক্রাউন নামের একটি বাল্ব তৈরির কারখানা ছিল, যা ১০ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে এবং জমিটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি অস্তিত্বহীন হওয়া সত্ত্বেও এখনো সেখানে ডাকযোগে চিঠি পৌঁছায়।
গত বৃহস্পতিবার কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে মোংলা বন্দর থেকে এই চারটি গাড়ি জব্দ করা হয়, যার প্রতিটির মূল্য কোটি টাকার বেশি। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এই শুল্ক ফাঁকি ধরতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিআরটিএ এবং কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা এবং শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে আসছে। এখন পর্যন্ত মোট ২৭টি চালানের মাধ্যমে ১ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল তারা। ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রথম চালানটি আনা হয়। এরপর বিভিন্ন বছরে এক থেকে ছয়টি করে মোট ২৭টি চালান এসেছে। কাস্টমস লক্ষ্য করেছে যে, আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যের তুলনায় পণ্যের প্রকৃত শুল্কায়নমূল্য অনেক বেশি ছিল—কিছু ক্ষেত্রে ব্যবধান ছিল দেড় থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত।
এর আগে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম বন্দর এবং ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোর মাধ্যমে তাদের সব চালান খালাস করেছিল। তবে এবার প্রথমবারের মতো মোংলা বন্দর দিয়ে আনা চালানের পণ্য খালাসের আগেই জব্দ করা হয়। জাপানের আশিকাগা-শি শহরের মাহি কার পোর্ট প্রতিষ্ঠানটি এই গাড়ি এবং পূর্বের যন্ত্রাংশগুলো রপ্তানি করেছে। এনবিআরের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের পর থেকে প্রায় সব চালানের রপ্তানিকারক ছিল এই মাহি কার পোর্ট, কেবল একটি চালান এসেছে দুবাইয়ের মেগাসিটি জেনারেল ট্রেডিং থেকে।
মোংলা বন্দরের পাশাপাশি কাস্টমস গোয়েন্দারা চট্টগ্রাম থেকে একটি বিএমডব্লিউ এবং কক্সবাজার থেকে আরও তিনটি গাড়ি জব্দ করেছেন, যেগুলোর বৈধ নথিপত্র ব্যবহারকারীরা দেখাতে পারেননি। বর্তমানে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ জানিয়েছেন, গত ১২ বছরে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসা ২৭টি চালানে আসলে কী কী পণ্য এসেছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা চালানে নিয়োজিত এম জেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার মাসুদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।




