জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করে। রায়ের সময় অপর দুই বিচারক ছিলেন মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। সাজাপ্রাপ্তরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই পলাতক।

এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। প্রায় দশ মাস পরে দলের সাধারণ সম্পাদকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে রায় এল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এ বিচারকাজ শুরু হয়। আজকের রায়টি গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় সপ্তম। দুই ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে মোট ৬৮ জন আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড; তাঁদের মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তিনটি ধারা আনা হয়েছে। প্রথম ধারায় বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেলে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের সাথে ফোনে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন—'মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?' ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার 'রাজাকারের বাচ্চা' মন্তব্যকে সমর্থন দেন। ১৫ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে 'আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ' বলে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন। ১৬ জুলাই তথ্য প্রতিমন্ত্রী পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশ দেন এবং চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র নাছিরকে এলাকা দখলে রাখতে বলেন। এ নির্দেশের পর চট্টগ্রামে তিনজন এবং রংপুরে আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হন।

দ্বিতীয় ধারায় ১৭ জুলাই তেজগাঁও কার্যালয়ে নেতাদের প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ, ১৮ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে রাজপথে নামার আহ্বান, ১৯ জুলাই 'শুট অ্যাট সাইট' অর্থাৎ দেখামাত্র গুলির নির্দেশ, শেখ হাসিনার সাথে ফোনে ষড়যন্ত্র, সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় ধারায় ৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে রুখে দাঁড়ানোর নির্দেশ। এসবের ফলে ৪-৫ আগস্ট মিরপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহীতে অসংখ্য হত্যা। সব মিলিয়ে ১৪০০-এর বেশি নিহত ও ২৫ হাজারের বেশি আহতের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধে সমর্থন দেন। নিজ এলাকা মাদারীপুরে সাবেক মেয়রের মাধ্যমে দমন অভিযান চালান, যাতে ১৮-১৯ জুলাই দীপ্ত দে ও তৌহিদ নিহত হন। ৪ আগস্ট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, পরে বাংলামোটর ও পল্টনে চারজন নিহত। ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন স্থানে ১৩ জন নিহত।

মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে—১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ে কোটার যৌক্তিকতা নেই মন্তব্য, ১৪ জুলাই গণভবনে হাসিনার বক্তব্যে সমর্থন, রাতে ঢাবি এলাকায় উসকানি, ১৯ জুলাই প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে হুমকি। তাঁর এলাকায় ১৯ জুলাই ছয়জন নিহত। ২০ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সাথে ফোনে টিভি বন্ধের নির্দেশ, ১৮ ও ২২ জুলাই চারটি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করা হয়। ৪ আগস্ট সংসদ ভবন এলাকায় প্রেস ব্রিফিংয়ে দমন নির্দেশ।

শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে—শেখ হাসিনা ও কাদেরের নির্দেশে যুবলীগকে সশস্ত্র হামলার নির্দেশ। ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে তিনজন, ১৯ জুলাই মহাখালীতে ছয়জন, ১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে উসকানি, ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে চারজন, ৫ আগস্ট রাজশাহীতে দুইজন নিহত।

মাইনুল হোসেন খান—১২ জুলাই সিলেটে উসকানি, ১৯ জুলাই মিরপুরে নিজে অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ২৬ জন নিহত। ৪ আগস্ট ১২ জন, ৫ আগস্ট ২০ জন নিহত।

সাদ্দাম হোসেন—১১ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে হুমকি, ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ বাস্তবায়নে ছাত্রলীগকে প্ররোচনা, ১৫ জুলাই হামলার নেতৃত্ব, ১৬ জুলাই দেখে নেওয়ার হুমকি। ১৮ জুলাই সারা দেশে ২৩ জন নিহত।

শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান—১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে উসকানি, ১৫ জুলাই হামলার নির্দেশ, ১৬ জুলাই সাদ্দামের হুমকিতে সমর্থন। ১৮ জুলাই ২৩ জন নিহত। সবাইকে ১৪০০-এর বেশি হত্যা ও ২৫ হাজার আহতের অভিযোগে দায়ী করা হয়েছে।