যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিলের (সিএআইআর) দেওয়া তথ্যমতে, দেশটির কেন্দ্রীয়, অঙ্গরাজ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অন্তত ৯৭ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এছাড়া আরও এক ডজনেরও বেশি প্রার্থীর চূড়ান্ত ফলাফল গণনার অপেক্ষায় রয়েছেন, তবে তারা বর্তমানে এগিয়ে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ব্যাপক জয় আগে দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, গত বছর নিউইয়র্ক নগরের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির বিশাল ব্যবধানে জয় মুসলিম প্রার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল এবং এবারের ফলাফলে তার প্রভাব স্পষ্ট। এবার প্রাইমারি নির্বাচনের বাধা পেরিয়ে মোট ১৬৮ জন মুসলিম প্রার্থী মূল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন, যার নাম আবদুলরহমান আল-সাইয়েদ। তিনি আগামী ছয় বছর এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন সাতজন মুসলিম প্রতিনিধি, যাদের মধ্যে ছয়জন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে যুক্ত হচ্ছেন। এদের মধ্যে বর্তমান সদস্য ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন এবং লতিফা সাইমনের পাশাপাশি নতুন মুখ হিসেবে যোগ দিচ্ছেন আদম হামাউই ও দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। ক্যালিফোর্নিয়ার চতুর্দশ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আয়েশা ওয়াহাব জয় নিশ্চিত করতে পারলে তিনিও প্রতিনিধি পরিষদে যোগ দেবেন। এছাড়া জর্জিয়া থেকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন রুয়া রোমান।

অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে আরও ৩৯টি পদে মুসলিম প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং অঙ্গরাজ্য আইনসভা ও সিনেটের সদস্যরা। স্থানীয় পর্যায়ে ১৬ জন এবং শিক্ষা ও স্কুল বোর্ডে ২৭ জন মুসলিম প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া আটজন বিচারক হিসেবে জয়ী হয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সাফল্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশটিতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব এবং বিদ্বেষ গত এক প্রজন্মের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার মতো ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে গুলি চালানো এবং হিজাব পরিহিন নারীদের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

ভোটের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মুসলিম ভোটারদের ৮০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়েছেন মাত্র ৬ শতাংশ। তবে ভোটারদের একটি বড় অংশ দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নীতিগত বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আইএসপিইউ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ (প্রায় ৫৫ লাখ) মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বেড়েছে। নিবন্ধিত মুসলিম ভোটারদের মধ্যে ৯৩ শতাংশই ভোট দিয়েছেন এবং ভোটার নিবন্ধনের হার গত এক বছরে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভোট দেওয়ার পেছনে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ইসলামবিদ্বেষ এবং গাজা ও ফিলিস্তিনের মানবাধিকার ইস্যু। সিএআইআর-এর জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ ভোটার মুসলিমবিরোধী পরিস্থিতির কারণে ভোট দিতে উৎসাহিত হয়েছেন এবং ৮০ শতাংশের মতে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তাদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মতো সাধারণ মার্কিন ইস্যুগুলোও তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল। জেনারেশন জি বা নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের মধ্যে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ বেশি বলে মনে করেন সামিরা মুনশি। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান প্রজন্ম নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী হতাশা কাটিয়ে আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হচ্ছে।