গত ২৬ আগস্ট নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে একটি বিশাল হিমবাহ ও শিলাখণ্ড ধসে পড়ে। প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার আয়তনের ওই অংশটি প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার নিচে নেমে গিয়ে ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে। এতে সৃষ্ট প্রবল কম্পন ভূমিকম্প হিসেবেও রেকর্ড হয়। ধসের ফলে প্রায় ১১ কোটি ঘনমিটার বরফ ও তুষার উপত্যকায় নেমে আসে এবং ঘণ্টায় ১৭৭ কিলোমিটারের বেশি গতিতে এক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়। এ দুর্যোগে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫ হাজারের বেশি। পানি, বরফ, শিলা ও পলির সেই স্রোত তিব্বতের গিরং অঞ্চলসহ নেপালের বিভিন্ন জনপদ, ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বহু মানুষ আটকা পড়েন এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন যোগাযোগ থেকে।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ ও ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর গবেষকরা এ ঘটনার প্রথম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, জলবায়ু বিপর্যয়ই মূলত এই হিমবাহ ধসকে উস্কে দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা এখন প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু গত জুলাই ও আগস্টেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দেড় ডিগ্রি বেশি ছিল, যা ছিল রেকর্ডের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ দুই মাস। হিমবাহ ধসের আগের কয়েক দিনে তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এর ফলে হিমবাহটি আগে থেকেই উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গিয়েছিল এবং এর আশপাশের স্থায়ীভাবে জমাট মাটি (পারমাফ্রস্ট) দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৯৮০-এর দশক থেকে হিমালয়ে হিমাঙ্কের উচ্চতা প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার করে বেড়ে চলেছে। অর্থাৎ যে উচ্চতায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে, তা ক্রমেই উপরে উঠছে, ফলে আরও বেশি এলাকা বরফ গলার ঝুঁকিতে পড়ছে। ধসের স্থানটির চারপাশের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা বরফ সরে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢালে অস্থিরতা তৈরি হয়। পাশাপাশি বরফ গলা পানি জমে ঢালের ভার আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১৫ সালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পও পাহাড়ি ঢাল দুর্বল করতে ভূমিকা রেখেছিল, তবে আগস্টের ধসে তার সুনির্দিষ্ট প্রভাব নিশ্চিত করা যায়নি।

গবেষক দলের প্রধান ফ্রিডেরিকে অটো বলেছেন, ‘হাজার হাজার মাইল দূরে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার মূল্য নেপালের মানুষ জীবন দিয়ে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর উঁচু অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে স্থানীয় অভিযোজন সত্ত্বেও ভাটির মানুষকে এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির নিঃসরণ দ্রুত শূন্যে নামানো না গেলে আগামী বছরগুলোয় এমন আরও বিপর্যয় অনিবার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। গবেষণায় বলা হয়েছে, এত বড় শিলাধসের ঘটনা অত্যন্ত বিরল— আনুমানিক এক হাজার থেকে দশ হাজার বছরে একবার ঘটতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিযোজনের সীমাও ইতিমধ্যে স্পর্শ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষণে গবেষকরা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে এই দুর্যোগের একমাত্র কারণ বলছেন না। তবে তাঁদের মতে, বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক কাঠামো অস্থিতিশীল করতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা যুক্তিসংগতভাবে প্রতীয়মান। সহ-গবেষক বেন ক্লার্ক বলেন, ‘আমরা দেখেছি জলবায়ু পরিবর্তন উঁচু পাহাড়ি পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে, যা এই ধসের সম্ভাব্য অনেক কারণের ওপর প্রভাব ফেলছে।’

এদিকে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা চেয়ে জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে নেপাল। ওই তহবিল থেকে সহায়তা পেতে জলবায়ু সংকটের সঙ্গে দুর্যোগের সম্পর্ক প্রমাণের প্রয়োজন হয়। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল চীন ও ভারতের মতো বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে ‘জেগে ওঠার’ এবং এই বিপর্যয়ের যৌথ দায় স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন। ডব্লিউডব্লিউএ-এর অংশ রেডক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা মাধব উপ্রেতি বলেন, বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ ব্যাপকভাবে কমানো ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার কোনো কার্যকর পথ নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘কল্পনাতীত মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। যে দেশটি সমস্যা তৈরিতে কার্যত ভূমিকা রাখেনি, তার এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে তাদের সৃষ্টি না করা সংকট মোকাবিলায় ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’