রোববার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘নেভিগেটিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন: ফরেন পলিসি অ্যালাইনমেন্ট অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইনস্টিটিউট অব পলিসি, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফর ডেভেলপমেন্ট (আইপিজিএডি) এর আয়োজনে এই আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন জ্বালানি ও অর্থনীতিবিদরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা হোসেন।

বৈঠকে মূল বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক মুশতাক খান। তাঁর বিশ্লেষণে জ্বালানি খাতের বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্য দুটি ভিন্ন মাত্রা বিবেচনার তাগিদ দেওয়া হয়। একদিকে রয়েছে স্বল্পমেয়াদি সরবরাহের ঘাটতি; অপরদিকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ও উৎপাদন-সংকট। এই দুইয়ের সমন্বিত মূল্যায়ন ছাড়া সমস্যার গভীরতা অনুধাবন সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক খান আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে চার গুণ বৃদ্ধি পেলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খরচ বেড়েছে ১১ গুণ, আর ক্যাপাসিটি চার্জ বৃদ্ধি পেয়েছে ২০ গুণ। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও কেবল কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ লুটের লক্ষ্যেই বহু বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবণতা নয়; বরং পরিকল্পিত অপচয়ের দৃষ্টান্ত।

২৫ বছর মেয়াদি সার্বভৌম চুক্তির আইনি জটিলতা নিয়ে সবাইকে সতর্ক করেন মুশতাক খান। ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির উদাহরণ টেনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, বকেয়া বিল নিয়ে সাধারণ আন্তর্জাতিক সালিশে গেলে বাংলাদেশ নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়বে। কারণ চুক্তির দলিলে পাওনার বৈধতা আইনি ভাষায় প্রতিষ্ঠিত। বরং আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে চুক্তি সম্পাদনের সময় ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম সংঘটিত হয়েছিল। আইনি পরিভাষায় একে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বলা হয়—অর্থাৎ চুক্তিটি গোড়া থেকেই বাতিলযোগ্য। লন্ডনের কিংস কাউন্সিলের বিশ্বমানের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এ মামলায় বাংলাদেশের জয়লাভের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সফলতার জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি ইনভেস্টিগেশন কোম্পানির সহযোগিতা অপরিহার্য।

আদানি গ্রুপ সম্পর্কিত জটিলতা নিরসনে বিকল্প প্রস্তুত রাখা ও কৌশলগত দরকষাকষির পরামর্শ দেন তিনি। এ লড়াইকে তিনি সাধারণ আমলাতান্ত্রিক কাজ হিসেবে দেখছেন না; বরং একে দেশ বাঁচানোর সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করেন। সংকট ব্যবস্থাপনার তদারকি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে নেওয়ার আহ্বান জানান অধ্যাপক খান। তাঁর বিশ্বাস, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সরাসরি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।

‘সংকটের মূল কারণ নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব’—এই মন্তব্য করেন ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারগুলোর দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হয়েছে। ভোলায় বিপুল গ্যাস মজুত থাকা সত্ত্বেও পেট্রোবাংলার হাতে ৪ টিসিএফ মজুত থাকলেও উৎপাদন সীমাবদ্ধ মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। তুলনামূলকভাবে শেভরন ১ দশমিক ১০ টিসিএফ মজুত থেকে দৈনিক ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। এটি দেশের চরম ব্যর্থতা বলে তিনি আখ্যায়িত করেন।

কুইক রেন্টাল ও এলএনজি আমদানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন মোল্লা আমজাদ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে আবাসিক খাতে ইনভার্টার এসি ও বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় ও উদ্যোক্তা অনুষদের সহযোগী ডিন সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা মারাত্মকভাবে শোষিত হয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের চরম ব্যর্থতার ফলে সর্বত্র সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা উল্লেখ করেন, অসম চুক্তিগুলোর কারণে বাজেটে বিপুল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি অবকাঠামো যদি বিদেশি শক্তির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে—এই সতর্কবার্তা দেন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ফেলো লাম-ইয়া মোস্তাক জানান, দেশের জ্বালানি আমদানির ২০ থেকে ২৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এই একক রুটের ওপর অতিনির্ভরতা অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, চীনের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষের কাছে সংকটের প্রকৃত চিত্র ও স্বচ্ছতা তুলে ধরার আহ্বান জানান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফেরদৌস বাপ্পী।

‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম সোলার প্যানেল ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর থেকে শুল্ক ও করের বোঝা অবিলম্বে কমানোর দাবি জানান। সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমেই কেবল জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব বলে তিনি মত দেন।

কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পেরিয়েও পেছনের কারণ অজানা রয়ে যাওয়ার প্রশ্ন তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক। জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবিও জানান তিনি।