২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ আদায়ের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসার মসজিদে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং ছররা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসা মুসল্লি ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো হলে সেদিন যাত্রাবাড়ীতে দুজনসহ সারাদেশে ২৩ থেকে ২৪ জন মাদ্রাসাছাত্র প্রাণ হারান। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জবানবন্দিতে এই তথ্য তুলে ধরেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার সাক্ষী মুহাম্মদ রিদওয়ান হাসান। যাত্রাবাড়ী জামিয়া ইসলামীয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক রিদওয়ান হাসান এই মাদ্রাসারই প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ২০১৩ সাল থেকে সেখানে শিক্ষকতা করে আসছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসানকে (তাইম) হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী তিনি।
জবানবন্দিতে রিদওয়ান হাসান জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাত ৮টার দিকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী আহমদ আব্দুল্লাহকে (১৪) প্রথমে গুলি করে গুরুতর আহত করে পুলিশ। এরপর পুলিশ সাঁজোয়া যান দিয়ে তাকে চাপা দেয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ২০ জুলাই দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফ্লাইওভারের পাশে প্রকাশ্যে গুলি করে একজনকে হত্যা করে পুলিশ। পরে জানা যায়, নিহত ব্যক্তি পুলিশ সদস্যের ছেলে, যার নাম ইমাম হাসান।
২০২৪ সালের ৩ আগস্টের বর্ণনা দিয়ে রিদওয়ান হাসান বলেন, সেদিন যাত্রাবাড়ীতে ‘আমারও কিছু বলার আছে’ নামে কর্মসূচি পালন করেন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও আলেম সমাজ। এই কর্মসূচিতে পুলিশ এসে অবিলম্বে তা শেষ করতে বলে। সে সময় শনির আখড়া সেতুর নিচে ছাত্রলীগ, যুবলীগের অসংখ্য নেতা–কর্মী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মারমুখী অবস্থান নেন। পরে তাঁরা পুলিশের সাহায্যে বাড়িতে ফিরে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা দুইটায় তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে মিছিল নিয়ে গণভবনের উদ্দেশে রওনা হন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে এলে খবর পান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে গেছেন। সেনাবাহিনী সদস্যদের সঙ্গে ছাত্র–জনতার উষ্ণ আলিঙ্গনের দৃশ্য দেখে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরে গণভবনের দিকে যাওয়ার পথে ওয়ারীর কাছাকাছি এসে মোবাইলে জানতে পারেন, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছে এবং যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসায় তিন ছাত্র–জনতার মরদেহ আনা হয়েছে।
সেদিন যাত্রাবাড়ীতে ৫ থেকে ৬ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আলেমসহ প্রায় ৬০ জনের মতো ছাত্র–জনতাকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ ও বিজিবি। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠন, জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং যারা এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে তাদের বিচার চান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন রিদওয়ান হাসান। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে তাইম। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন পলাতক। তারা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক উপপরিদর্শক সাজ্জাদ উজ জামান। কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী।




