জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে একমত থাকলেও, জীবাশ্ম-জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘকাল ধরে এই সংকট নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রেতা এবং আইনপ্রণেতাদের চাপে অনেক প্রতিষ্ঠান এই বাস্তবতা মেনে নিতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে পিটার নুয়েল ও ম্যাথু প্যাটারসন তাঁদের 'ক্লাইমেট ক্যাপিটালিজম: গ্লোবাল ওয়ার্মিং অ্যান্ড দ্য ট্রান্সফরমেশন অব দ্য গ্লোবাল ইকোনমি' গ্রন্থে 'সবুজ পুঁজিবাদ' বা পরিবেশবান্ধব পুঁজিবাদের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছেন। লেখকদের মূল যুক্তি হলো, স্বল্প মেয়াদে পুঁজিবাদকে সম্পূর্ণ বাতিল করা অসম্ভব, তাই বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থার মধ্যেই কার্বনমুক্তির পথ খোঁজা বেশি বাস্তবসম্মত।
বইটিতে কার্বন মার্কেটের কার্যকারিতা এবং এর সীমাবদ্ধতা বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কিয়োটো চুক্তির মাধ্যমে কার্বন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং 'ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম' (সিডিএম)-এর মাধ্যমে বৈশ্বিক কার্বন বাজার তৈরির প্রচেষ্টাকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কার্বন হ্রাসকারী প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে 'কার্বন ক্রেডিট' তৈরি করা হয়, যা উন্নত দেশগুলো তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবহার করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে পূর্ণাঙ্গ 'ইমিশন ট্রেডিং স্কিম' চালু করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমাতে সক্ষম হয়েছে। তবে লেখকরা সতর্ক করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) বা সুনামের খাতিরে কোম্পানিগুলো এই পথে হাঁটছে, যা প্রকৃত পরিবেশগত উন্নতির চেয়ে জনসংযোগের হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
নুয়েল ও প্যাটারসন 'কার্বন উপনিবেশায়ন' বা কার্বন কলোনাইজেশনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, বাইরের বিনিয়োগ ও জ্ঞানের মাধ্যমে পরিচালিত সংরক্ষণ প্রকল্পগুলো অনেক সময় স্থানীয় মানুষের জীবিকার ক্ষতি করে। এছাড়া চীন ও ব্রাজিলের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও, তা প্রকৃত অর্থে জলবায়ু রক্ষায় কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। লেখকদের মতে, কার্বন পুঁজিবাদের শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে যাতে বিলাসিতার কারণে সংকট সৃষ্টিকারীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয় এবং যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়, তাদের দুর্ভোগ লাঘব করা যায়।
বইটিতে জলবায়ু পুঁজিবাদের চারটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমটি হলো 'ক্লাইমেট ইউটোপিয়া', যেখানে স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি আদর্শ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। দ্বিতীয়টি 'স্থির অবস্থা', যেখানে কার্বন মার্কেট কেবল জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে পরিণত হবে। তৃতীয়টি 'ক্লাইমেট ডিস্টোপিয়া', যেখানে জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কার্বন উপনিবেশায়নের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো কেবল সেবা প্রদানকারী হিসেবে থেকে যাবে। চতুর্থটি হলো 'জলবায়ু কেইনেসীয়বাদ', যেখানে রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে কার্বন মার্কেটে হস্তক্ষেপ করবে এবং একটি 'গ্রিন নিউ ডিল' গঠন হবে। লেখকরা মূলত এই চতুর্থ মডেলটির সমর্থক, যেখানে রাষ্ট্র একটি কাঠামো তৈরি করে দেবে এবং বাজার তার চাহিদা অনুযায়ী সাড়া দেবে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই নতুন অর্থনৈতিক মডেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি, বনায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন খাতের মতো জায়গাগুলোতে ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক লাভ ও পরিবেশগত সুরক্ষা—উভয় সুবিধা পেতে পারে। যেমন, সৌর লণ্ঠন, উন্নত চুলা বা ফাঁপা ইটের ব্যবহার এই প্রকল্পের আওতায় আনা সম্ভব। তবে সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারভিত্তিক এই সমাধানগুলো ফাইন্যান্স ক্যাপিটালের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া জলবায়ু অভিবাসী ও শরণার্থী সংকটের মতো মানবিক দিকগুলো এই বাজারমুখী আলোচনায় কিছুটা উপেক্ষিত থেকেছে। শেষ পর্যন্ত, পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলন বর্তমানে খুব একটা কার্যকর না হওয়ায় বাজার ব্যবস্থার সংস্কারই এখন একমাত্র চলনসই পথ বলে মনে করেন লেখকরা, যদিও এর রাজনৈতিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো অস্পষ্ট।




