যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জয়জয়কারের ফলে টেক জায়ান্টদের মধ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণের এক তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বর্তমানে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে প্রায় ৫,০০০ ডেটা সেন্টার গড়ে উঠেছে, যার মূল চালিকাশক্তি হলো হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলো। বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা JLL-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টার খাতের বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ হতে পারে।
এই দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ কর ছাড়ের সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্য ডেটা সেন্টার উন্নয়নের জন্য বিশেষ কর প্রণোদনা প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে বিক্রয় কর (sales tax), ব্যবহারের কর (use tax), সম্পত্তি কর (property tax) এবং আর্থিক লেনদেনের কর থেকে অব্যাহতি। তবে এই সুযোগ পাওয়ার শর্তাবলি রাজ্যভেদে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, টেক্সাস রাজ্যে এই সুবিধা পেতে হলে ন্যূনতম ২০০ মিলিয়ন ডলারের মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়। মেইন রাজ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গার মাপ এবং কিছু রাজ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরির শর্ত রয়েছে। অন্যদিকে নিউইয়র্কের মতো কিছু রাজ্যে কোনো ন্যূনতম বিনিয়োগের শর্ত নেই এবং সম্পত্তি, পরিষেবা, সরঞ্জাম ও চুক্তির বিস্তৃত ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়া হয়।
ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশনের চক্রটি অত্যন্ত দ্রুত। বৈদ্যুতিক সিস্টেম বা ব্যাটারির স্থায়িত্ব ২০ বছরের বেশি হলেও, এআই কম্পিউটিংয়ের প্রচণ্ড চাপের কারণে ক্লাউড কম্পিউটিং সরঞ্জামগুলো মাত্র তিন বছরের মধ্যেই পুরনো হয়ে যায়। ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের মতে, একটি ৫ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার প্রতি বছর যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের পেছনে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করতে পারে। ফলে বিক্রয় করের ছাড় তাদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ। যেসব রাজ্যে বিক্রয় কর নেই, যেমন নিউ জার্সি, সেখানে সম্পত্তি কর মওকুফ বা ট্যাক্স ক্রেডিটের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হয়।
তবে এই কর ছাড়ের ফলে অনেক রাজ্য মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়ছে। 'গুড জবস ফার্স্ট'-এর এক তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, অন্তত ১৪টি অঙ্গরাজ্য ডেটা সেন্টারের কারণে তাদের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে ২০২০ সালে কর ছাড় পাওয়া প্রকল্পের সংখ্যা ৬টি থাকলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২৭টিতে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে রাজস্ব ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে। ইলিনয়ে সার্ভার, কম্পিউটার, ডাটা স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো এবং সফটওয়্যারের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ওপর কর ছাড় দেওয়া হয়। এছাড়া নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরির ওপর ২০ শতাংশ আয়কর ক্রেডিট দেওয়া হয়। এই সুবিধাগুলো ২০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে, যদি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ অব্যাহত রাখে।
কর ছাড়ের এই সুযোগগুলো টেক জায়ান্টদের জন্য একেবারে সহজ নয়। ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে বিনিয়োগের ন্যূনতম সীমা ভিন্ন। কেনটাকিতে এটি ৪৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, যেখানে মেরিল্যান্ডের কিছু অংশে এটি মাত্র ২ মিলিয়ন ডলার। ভার্জিনিয়া, যাকে 'ডেটা সেন্টার অ্যালি' বলা হয়, সেখানে বিশ্বব্যাপী হাইপারস্কেল সুবিধার প্রায় ৩৫ শতাংশ অবস্থিত। সেখানে কর ছাড় পেতে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং স্থানীয় গড় মজুরির ১৫০ শতাংশের বেশি বেতন দিয়ে অন্তত ৫০টি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির শর্ত রয়েছে।
তবে এই বিপুল বিনিয়োগ ও কর ছাড় স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রকৃত প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জর্জিয়া টেকের জুলাই মাসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেটা সেন্টার স্থাপনের ফলে স্বল্পমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আসে—কর্মসংস্থান ৩.৫%, মজুরি ৫% এবং পারিবারিক আয় ২% বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই লাভ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম এবং সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। উল্টো দেখা গেছে, ডেটা সেন্টারের অত্যধিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রুকিংস থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ডেটা সেন্টারগুলো যতটা কর্মসংস্থান তৈরি করে বলে দাবি করা হয়, বাস্তবে তা অনেক কম এবং অনেক ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া কেন্দ্রগুলোই সবচেয়ে কম কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।




