জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর। তবে এক বছর আগে শিক্ষার্থীদের মনে যে উচ্চাশা ও উদ্দীপনা ছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দেওয়া ইশতেহারের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মোট ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করেছিল ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’। বাকি পাঁচটি পদের মধ্যে দুটি জয়ী হয় জাতীয় ছাত্রশক্তি, দুটি স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ভিপি পদে জয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু। সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট তাদের ইশতেহারে ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট ৪৬টি বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র ১৩টি বাস্তবায়িত হয়েছে। ৩০টি প্রতিশ্রুতি এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে, যার বেশিরভাগই কেবল কমিটি গঠন বা সুপারিশ পাঠানোর অপেক্ষায়। দুটি প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি এবং একটি স্বাস্থ্যবিমার বিষয় আগে থেকেই চালু ছিল।

শিবির-সমর্থিত প্যানেলের যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ থেকে গেছে, তার মধ্যে রয়েছে সেশনজট নিরসন, শিক্ষা ক্যালেন্ডার বাস্তবায়ন, সম্পূরক বৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠন। এছাড়া গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো, সফটওয়্যার সরবরাহ এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যগুলোও পুরোপুরি সফল হয়নি। পরিবেশ রক্ষায় মহাপরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়ন হয়নি। ডাইনিংয়ে ভর্তুকি ও ছাত্রী হলের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। যদিও অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং ওষুধের প্রাপ্যতা বেড়েছে, তবে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা কার্যকর না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল সুবিধা এবং বাসের রুট ও ট্র্যাকিং অ্যাপ চালু হওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাকসু নেতাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নিরপেক্ষ থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দেন। অন্যদিকে, দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া জিএস মাজহারুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারণায় সক্রিয় দেখা গেছে। অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টিকে সাধারণ ভোটারের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে দেখছেন। যদিও মাজহারুল ইসলাম দাবি করেছেন, ক্যাম্পাসের বাইরে ব্যক্তিগত আদর্শিক কারণে তিনি এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।

নেতাদের ব্যক্তিগত আচরণ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও আলোচনায় এসেছে। স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা সম্পাদক হোসনে মোবারক এবং কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতি খাবারের মান নিয়ে তৎপরতা চালাতে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে একটি দোকানের কর্মচারীর ওপর হালিমের বাটি ছুড়ে মারার ঘটনা ব্যাপক সমালোচিত হয়। এছাড়া ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর বিরুদ্ধে রিকশা চালকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে একটি অডিও ক্লিপের ভিত্তিতে। পাশাপাশি ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও হলের আবাসন ধরে রাখা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিতর্কিত অর্থায়নের অভিযোগও সামনে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম মনে করেন, দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি ছিল ঐতিহাসিক। তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হওয়ায় এখন নতুন নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও জাকসু নেতাদের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীরা আস্থা হারাচ্ছেন।